fgh
ঢাকারবিবার , ২৯ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

বাঙালিদের দমাতে তারা সহিংস কৌশল ব্যবহার করছে

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ২৯, ২০২৬ ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ । ৩৬ জন

ইসলামাবাদে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার সিরিল পিকার্ড (১৯১৭-৯২) দীর্ঘদিন ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস (এফসিও) কর্মকর্তা হিসেবে সরকারের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন (তিনি ১৯৬৬-৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন)।

পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাতদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে নিজ রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে ‘মূল বিষয় হলো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও তার উপদেষ্টারা বিশ্বাস করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের দায়িত্ব এবং তা তাদের ক্ষমতার মধ্যেই আছে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।’ তার বাস্তববাদী উপসংহার ছিল, ‘এই পর্যায়ে তাদের অন্যভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা সম্পূর্ণ নিষ্ফল হবে এবং এটি আমাদের (ব্রিটিশ) স্বার্থের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।’

ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষা পাবে যদি প্রধানমন্ত্রী থেকে ‘বোঝাপড়ার একটি ব্যক্তিগত বার্তা’ পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত পিকার্ড নিজেই সেই বার্তার খসড়া তৈরি করেন, যা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠান। সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে তাদের চা বাগান ও পাট উৎপাদনের ব্যবসা আছে।

তবে পাকিস্তানের আসন্ন সরকারি সহিংসতার বিষয়টি হাইকমিশনারের অজানা ছিল না। তাদের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের বিশেষজ্ঞরা মার্চের শুরুতেই সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি অনুমান করেছিলেন যে ‘স্বল্পমেয়াদে (ইয়াহিয়া খান) ও সেনাবাহিনী ব্যাপক রক্তপাত ঘটিয়ে কিছু সময়ের জন্য পূর্বাঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, কিন্তু তারা এ অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে ধ্বংস করার চেষ্টা ব্যর্থ হবেই।’

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২৫ মার্চের সেনা অভিযানের আগেই আওয়ামী লীগ ব্রিটিশদের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা গণহত্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। শেখ মুজিবের একজন জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টা (পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) কামাল হোসেন ঢাকায় থাকা ব্রিটিশ সরকারের প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধি এফসিডি সার্জেন্টকে জানান যে তারা নিশ্চিত, ‘সেনাবাহিনী পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখতে চায়; এমনকি যদি তার জন্য অনেক বাঙালিকে হত্যা করতে হয়, তাহলেও তারা সেটি করবে।

’ তিনি বার্তাটি এভাবে পাঠান, ‘এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব জনমতকে বোঝাতে চাইবে যে পাকিস্তানে “গণহত্যা” (তিনি জোর দিয়ে শব্দটি ব্যবহার করেন) ন্যায্য।’ হোসেন ব্রিটিশদের অনুরোধ করেন, ‘উন্নত দেশগুলোর উচিত বর্তমান পাকিস্তানি শাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আসন্ন বিপর্যয় ঠেকানো যায়।’ তিনি মূলত বৈশ্বিক বাঙালি প্রবাসীদের উদ্বেগই প্রতিধ্বনিত করছিলেন; এরই মধ্যে সেনা অভিযানের এক সপ্তাহ আগে, ১৮ মার্চ—হংকংয়ের পাকিস্তানি কমিউনিটি জাতিসংঘে একটি টেলিগ্রাম পাঠায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়পাকিস্তানি সেনারা ইতিমধ্যেই নিরস্ত্র নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছে। পূর্ব পাকিস্তান এখন ভয়াবহ গণহত্যার চরম ঝুঁকির মুখে। মানবতাকে রক্ষার জন্য আমরা আপনাদের প্রভাব ও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাই।

এ ধরনের শত শত বার্তা জাতিসংঘে পাঠানো হয়েছিল।

এর পরও মার্চে কূটনীতিকরা পরিস্থিতিকে গণহত্যার চেয়ে গৃহযুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তনের বিভিন্ন স্থানে দুই ধরনের সহিংসতার খবর নিয়মিত আসতে থাকে। এসব ছিল সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এবং পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যেই পারস্পরিক কিছু সংঘর্ষের খবর। ৯ মার্চের একটি পরিস্থিতির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের সপ্তাহে জনতা ও সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৭২ জন নিহত ও ৩৫৮ জন আহত হয়েছে।

যদিও এ সংখ্যা আরো বেশি বলে আওয়ামী লীগ দাবি করে। একই সঙ্গে তারা এ ঘটনার সঠিক তদন্তও দাবি করে। সেনাবাহিনীর প্রতি আওয়ামী লীগ ও সাধারণ জনগণের ক্ষোভ তীব্র হতে থাকে। জনসাধারণের ছোট ছোট আক্রমণ এবং ক্যান্টনমেন্টে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে এ ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছিল।

ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদের নিয়ে, ‘যারা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।’ ১০ মার্চ তারা রাজধানীতে চেকপোস্ট বসায়, যদিও পরে তা তুলে নিতে বাধ্য হয়। এরপর তারা ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবস এবং ইয়াহিয়ার ঢাকা সফরের সঙ্গে মিলিয়ে ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালনের আহ্বান জানায়। একই সময়ে তারা ঢাকায় ‘হাস্যোজ্জ্বল মিছিল’ করছিল, যেখানে কিছু সদস্য লাঠি, বর্শা এমনকি ‘থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল বহন করছিল। এসব ছাত্র ‘হুমকিস্বরূপ’ ছিল।

এ কাজে তারা চুরি করা যানবাহনসহ বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করছিল। এর আগেই জাতীয়তাবাদী ছাত্ররা এক ব্রিটিশ ভ্রমণকারীকে জানিয়েছিল, তারা ল্যাবরেটরি থেকে উপকরণ লুট করে অস্ত্র তৈরি করছে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে আসন্ন সংঘর্ষের জন্য ভবনগুলোকে সুরক্ষিত করছে। এসব উসকানির মুখেও সেনাবাহিনীর ‘সংযম’ লক্ষ করা এবং প্রশংসা করা হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট নিয়ন্ত্রণ করছিল আওয়ামী লীগ, আর

সেনাবাহিনী ছিল ব্যারাকে সীমাবদ্ধ। পরিস্থিতি ছিল বিস্ফোরক। তবে তা গণহত্যার চেয়ে গৃহযুদ্ধের মতোই মনে হচ্ছিল।

মার্চে বেসামরিক জনতার মধ্যকার সহিংসতাও এ ধারণাকে জোরদার করে। চট্টগ্রাম থেকে বিহারি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছিল, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র; অগ্নিসংযোগও বেশি এবং কিছু ক্ষেত্রে বিহারিদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, যা তারা আত্মরক্ষায় ব্যবহার করেছে। গ্রামাঞ্চলে ‘স্বাধীন বাংলা এবং পাঞ্জাবিদের মৃত্যুর’ দাবিতে মিছিল হচ্ছিল।

ঢাকায় নিযুক্ত উপহাইকমিশনার মন্তব্য করেন, ‘আওয়ামী লীগ এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছে, যাতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষটাই বেশি গুরুত্ব পায়।’ বরিশালে পরিস্থিতি খারাপ ছিল, এমনকি পশ্চিমা লোকেরাও শত্রুতার শিকার হচ্ছিল। ঢাকার মিরপুরে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা তাদের ঘরে ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উর্দুভাষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

মার্চের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তানি নেতাদের মধ্যে আলোচনা ভেঙে যায়। ২৫ মার্চ রাত ও ২৬ মার্চ ভোরে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় কূটনীতিকরা বিস্মিত হন। কয়েকদিন পরিস্থিতি ও সহিংসতার মাত্রা পরিষ্কার ছিল না। গুলিবর্ষণের মধ্যে অফিসে সীমাবদ্ধ থেকে তারা মূলত সাংবাদিকদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছিল এভাবে, ‘প্রেস জানাচ্ছে গত রাতে আবার গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের মতে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর ঠাণ্ডা মাথায় সেনা হত্যাকাণ্ড, আর সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেনা ব্যবহৃত হচ্ছে।’ হাইকমিশনার পিকার্ড ‘বড় আকারের রক্তপাতের’ আশঙ্কা করেন এবং বলেন, ‘আমাদের প্রথম বিবেচ্য বিষয় হতে হবে আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা।

’ ঢাকার উপহাইকমিশনার পরদিন এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহিংসতার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তাকে জানানো হয়, প্রথম রাতেই প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে এবং অনুরোধ করা হয় ‘বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হোক, বিশেষ করে গণহত্যার বিষয়টি যেন তুলে ধরা হয়।’ আওয়ামী লীগের ওই ব্যক্তি আরো বলেন, তাদের সহকর্মীরা গ্রামাঞ্চলে চলে গিয়ে সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করবে।

ক্র্যাকডাউন শুরু হওয়ার দুইদিন পর হাইকমিশনার ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান। রাজধানীর বাইরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার অভিযানের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষও আক্রান্ত হচ্ছিল। হাইকমিশনার টেলিগ্রাম করে জানান—

.কাঁচা ঘর ও ছোট দোকানের পুরো এলাকা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং মালিকদের মেশিনগান দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আজ পুরান ঢাকার আরেকটি এলাকায় এবং রাতে গুলশান এলাকার বাইরের গ্রামগুলোতে একই ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে যে এ অভিযান জনগণের শত্রুদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। পুলিশের বড় অংশকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত রাতের ইপিআর সদর দপ্তরের গুলিবর্ষণ থেকে বোঝা যায়, অন্তত কিছু সদস্য এখনো প্রতিরোধ করছে। মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৫,০০০। …ইঙ্গিতগুলো দেখাচ্ছে যে সেনাবাহিনী একটি সন্ত্রাসের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে এবং এতে তারা এখন পর্যন্ত বেশ সফল।

একই দিনে আরেকটি টেলিগ্রামে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যার কথা জানান এবং কাছাকাছি ব্রিটিশ কাউন্সিল অফিস বন্ধ করার পরামর্শ দেন।

কয়েক দিনের মধ্যেই সহিংসতার ব্যাপ্তি স্পষ্ট হয়, কিন্তু তা তখনো গণহত্যার চেয়ে গৃহযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল। অথবা বিচ্ছিন্নতা ঠেকাতে কঠোর সরকারি পদক্ষেপ। পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ ও রেজিমেন্টের ওপর হামলা হয়। ছাত্রদের ওপরও আক্রমণ হয়; যাদের কাছে অস্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়।

তাছাড়া পিকার্ড মার্চের আলোচনা ব্যর্থতার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকেই দায়ী করেন, যাকে তিনি দুর্বল নেতা মনে করতেন। তিনি আপসহীন সমর্থকদের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও সেনাবাহিনীর কাছে অতিরিক্ত দাবি তুলেছিলেন। সেনাবাহিনী ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের বলেছিল, তারা কয়েক

দিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে। যদিও কূটনীতিকরা মনে করতেন, তারা আওয়ামী লীগের জনসমর্থনকে অবমূল্যায়ন করছে।

সামরিক গভর্নর টিক্কা খান গণহত্যার অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দেন এভাবে: ‘প্রেসে গণহত্যার কথা বলে প্রায় সবই বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে। অথচ সেনাবাহিনী মাত্র ২৭ জনকে হত্যা করেছে, তাও অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে।’ পাকিস্তানের প্রচলিত অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, ‘সমস্যা হলো সাংবাদিকরা দিল্লিভিত্তিক, যেখানে তারা কেবল ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করে।’ আওয়ামী লীগের নেতা পাকিস্তানের ওপর হস্তক্ষেপের যে আবেদন করেছিল তা ব্রিটিশ হাইকমিশনারের কাছে গুরুত্ব পায়নি।

কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা, যা নির্ভর করছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর। পিকার্ড সহিংসতা সম্পর্কে জানতেন। তবে তিনি এটিকে মূলত রাজনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বলে মনে করতেন, নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নয়। তার মতামত—

কিছু পশ্চিম পাকিস্তানির প্রতিক্রিয়া আরো উদ্বেগজনক। পাঞ্জাবি ও পাঠানদের মধ্যে বাঙালিদের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পাচ্ছে এবং তাদের শিক্ষা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্ট যে সেনাবাহিনী মানবজীবনের প্রতি উদাসীনতা দেখাচ্ছে এবং বাঙালিদের দমাতে সহিংস কৌশল ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক নেতাদের খুঁজে বের করে হত্যা করা হচ্ছে (পাকিস্তানের ইতিহাসে যার নজির নেই) এবং আমি মনে করি আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

তার দৃষ্টিভঙ্গি ঢাকায় আমেরিকান কূটনীতিকদের মতো নয়। তিনি সংঘাতটিকে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হিসেবেই দেখতেন, গণহত্যা হিসেবে নয়। এ বার্তাই লন্ডনে পৌঁছানো হয় এবং জনসাধারণকে জানানো হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব অ্যালেক ডগলাস ২৬ এপ্রিল পার্লামেন্টে বলেন, ‘পাকিস্তানে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তাতে আমরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি—কিন্তু এ ধরনের ঘটনা গৃহযুদ্ধেই ঘটে থাকে।’

ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস (এফসিও) কর্মকর্তাও জানত যে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জিতে পাকিস্তানের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত দমন-পীড়ন ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে ক্রমেই অবাস্তব করে তুলছে।

রাজনৈতিক সমাধানের আশায় ব্রিটিশরা ইয়াহিয়াকে বেসামরিক সরকারে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে এবং আওয়ামী লীগের সহনশীল নেতাদের সমর্থন নিতে পরামর্শ দেয়। মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর তারা নিয়মিত তার নিরাপত্তার বিষয়ে চাপ দেয়। তারা আরো জানায় যে উন্নয়ন সহায়তা পূর্ব পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। তারা সহিংসতা পছন্দ করে না।

ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান ছিল স্বার্থপরতা, রাষ্ট্রের বৈধতা ও হস্তক্ষেপ না করার নীতির মধ্যে লুকানো অসংগতিতে ভরা। তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল মনে করত এবং ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষার জন্য এর ভাঙন ঠেকাতে চাইত। স্থিতিশীলতাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে তারা বিশ্বাস করত পশ্চিম পাকিস্তান ‘বাঙালি প্রতিরোধকে’ পরাজিত করতে পারবে না। আশঙ্কা করত শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিজে নিজেই ভেঙে পড়বে।

এর মানে হলো কার্যত অরাজকতা এবং ব্রিটিশ অর্থনৈতিক স্বার্থের ধ্বংস। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এফসিও ও কনজারভেটিভ সরকারের নীতির মধ্যে প্রাধান্য ছিল। তাছাড়া ব্রিটিশ নাগরিকদের সরিয়ে নিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। এ কারণে ঢাকার হাইকমিশনার ২৯ মার্চ বার্তা পাঠান—

এ সময় পাকিস্তান সরকারের আচরণের কোনো সমালোচনা করলে এখানে ব্রিটিশ কমিউনিটির জন্য গুরুতর পরিণতি হতে পারে; বিশেষ করে যখন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ বাড়ছে। এমন কাজ সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করবে। আর তাদের সঙ্গেই আমাদের সর্বোত্তম সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

ফলে তারা পাকিস্তানের সামরিক সহিংসতার নিন্দা করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদরা বলেন, সহায়তা বন্ধ করে পাকিস্তানের ওপর চাপ দেয়ার কোনো লাভ নেই। কারণ ইয়াহিয়া কেবল বন্ধুদের পরামর্শই শোনেন।

এ পর্যায়ে ব্রিটিশরা অনুমান করতে পারেনি যে মে ও জুনে শরণার্থী সংকট তৈরি হবে। যেখানে প্রধানত হিন্দু

বাঙালিরা গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে যায়। এ শরণার্থী সমস্যা, যা সাংবাদিক, মানবিক সংস্থা ও ভারতের সফররত রাজনীতিবিদদের কারণে ব্যাপক প্রচার পায়, অনেক ক্ষেত্রে সেনা সহিংসতার চেয়েও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। ভারতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলায় এটি সংঘাতকে আন্তর্জাতিক করে তোলে এবং পাকিস্তান-ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে; অথচ এতদিন এটি কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

[অপর্ণা সুন্দর ও নন্দিনী সুন্দর সম্পাদিত ‘সিভিল ওয়ার ইন সাউথ এশিয়া-স্টেট, সভরেইনটি, ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক গ্রন্থে প্রকাশিত আ ডার্ক মসেসের ‘সিভিল ওয়ার অর জেনোসাইড? ব্রিটেন অ্যান্ড দ্য সিসেশন অব ইস্ট পাকিস্তান ইন ১৯৭১’ নিবন্ধের অংশবিশেষ। ভাষান্তর: বাশার খান]