কুষ্টিয়ার কথিত পীরকে পিটিয়ে হত্যার একদিন পেরিয়ে গেলেও থানায় কোনো মামলা হয়নি এবং কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। শনিবারের ঘটনার পর পুরো এলাকা থমথমে থাকলেও শোকের কোনো ছায়া নেই। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রোববার দুপুরে খুলনা রেঞ্জ পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, ঘটনার সময় অনেক লোকের উপস্থিতি থাকায় কারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন। তিনি বলেন, আমরা সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত ও তথ্য সংগ্রহ করছি। উপযুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন উপপরিদর্শক (এসআই) বলেন, যে সাতটি আইডি থেকে ভিডিওগুলো ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর দুই-একটির অ্যাডমিনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। এছাড়া হামলা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ১৫ থেকে ১৮ জনকেও শনাক্ত করা গেছে। এ বিষয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংসদ-সদস্য জানান, শামীমের আস্তানায় যারা হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও শামীমকে হত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একইসঙ্গে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রাখা হবে। নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান জানান, দুপুর ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রামে পৌঁছায়। বিকাল ৪টায় দক্ষিণ ফিলিপনগর ঈদগাহে জানাজা শেষে তাকে সিরাজনগর গোরস্থানে দাফন করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম ইসলাম বিরোধী বক্তব্য প্রচার করে আসছিলেন এবং নিজস্ব ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বিধান তুলে ধরে অনুসারীদের বিভ্রান্ত করতেন। তিনি নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো অস্বীকার করে ভিন্নধর্মী মতবাদ প্রচার করতেন। এমনকি অনুসারীদের হজ পালন করতে মক্কায় না গিয়ে স্থানীয় একটি বাঁশ বাগানের দরবারে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। এসব ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ ছিল। তবে তারা কোনোভাবেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করেন না।
কে এই কথিত ‘পীর’ শামিম : শামিম ১৯৮৪ সালে ফিলিপনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাশ করে পরবর্তীতে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে তিনি এমকম পাশ করেন।
স্থানীয়রা জানান, শামীম ঢাকায় মাস্টার্স সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং খাদেম হিসাবে সেখানে বসবাস শুরু করেন। মুরিদ হওয়ার পর শামিম
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ২০০৭ সালে শামিম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু তার বিয়ে ২-৩ মাসের বেশি টেকেনি। চার বছর আগে হঠাৎ করেই শামীম নিজ গ্রাম ইসলামপুর ফিরে আসেন এবং বাড়িতেই আস্তানা গড়ে তোলেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানায়, শামীমের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা জানার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা ছাড়াও মানুষকে জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ ছিল। আস্তানায় অভিযান চালিয়ে একবার শামিমকে গ্রেফতার করে জেল হাজতেও পাঠানো হয়েছিল।
পীর হত্যার প্রতিবাদে বরিশালে বিক্ষোভ : বরিশাল ব্যুরো জানায়, কুষ্টিয়ায় কুরআন অবমাননার অভিযোগে মাজারে হামলা-অগ্নিসংযোগ করে পীর হত্যাসহ মব সন্ত্রাসের প্রতিবাদে বরিশালে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়েছে। রোববার নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে গণতান্ত্রিকছাত্রজোটের উদ্যোগে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। এর আগে বিক্ষুব্ধরা নগরীতে একটি বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারসহ সারা দেশে মব সন্ত্রাস বন্ধের দাবি জানান।
এ সময় বক্তৃতা দেন-বরিশাল ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি একে আজাদ, সাধারণ সম্পাদক তুষার সেন, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুজয় শুভ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক ভূমিকা সরকার, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুজয় সরকার, বরিশাল জেলা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ মারিয়া মার্জা প্রমুখ।





