ঢাকাশনিবার , ১৮ মার্চ ২০২৩
  • অন্যান্য

রমজানের আগেই প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১৮, ২০২৩ ১২:৩৫ অপরাহ্ণ । ৯৪ জন
ছবি : সংগৃহীত

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী সপ্তাহ শেষে শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। প্রতিবারের মতো এবারো রমজানের আগেই অতি প্রয়োজনীয় বেশকিছু খাদ্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। এর মধ্যে চাল, ডাল, আটা, পিয়াজ, ময়দা, মসলা, ডিম, মুরগি, মাছ ও মাংসের দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা ভোক্তার পকেট কাটছে। এর প্রতিকারে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারছে না। বাড়তি দামের বোঝা বইতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষদের। রমজানে কী হবে- সেই চিন্তায় দিশাহারা তারা। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্‌শি বলেছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য মজুত রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, রমজান মাসে কোনো পণ্যের ঘাটতি হবে না।

সপ্তাহের ব্যবধানে পিয়াজের ঝাঁজ বেড়েছে। ভারত থেকে পিয়াজ আমদানি বন্ধ- এমন খবরে কেজিতে পিয়াজের দাম বেড়েছে ৩-৭ টাকা পর্যন্ত। রমজানে এ দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। প্রতিবছর রমজান মাস এলেই ছোলা, পিয়াজ ও ডালের বাজার অসহনীয় হয়ে ওঠে। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত সপ্তাহে দেশি পিয়াজ ৩৫-৩৭ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এ সপ্তাহে সেটা বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪২ টাকায়।

বাজারে চাল, ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম উচ্চমূল্যে এসে থেমে আছে। বাজারে দেখা গেছে, প্রতি কেজি মোটা চাল খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়, যা গত বছর এ সময়ে ছিল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায়। মাঝারি মানের চালের দাম পড়ছে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬২ টাকা। আর সরু চাল মিনিকেট ও নাজিরশাইল কিনতে হচ্ছে ৭০ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে। এক কেজি প্যাকেটের পোলাওয়ের চাল ১৭০ টাকায় ঠেকেছে, যা ২০ দিন বা ১ মাস আগেও ছিল ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানে বেশি কেনা হয় এমন সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ছোলার দাম কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ৯০ টাকায়, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ৮০ থেকে ৮২ টাকা। খোলা চিনি প্রতি কেজি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি নেই বললেই চলে। ১০ ও ১৫ টাকা বেড়ে বুটের ডাল ও মসুর ডালের কেজি দাঁড়ায় ১৪০ টাকায়। খেসারি ডাল ৮০-৯০ টাকা, অ্যাংকরের বেসন ৭৫-৮৫ টাকা এবং বুটের বেসন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়। পাঁচ লিটার তেল কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ৯০০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিনের দাম প্রতি কেজি ১৯০ টাকার মধ্যে। জানা গেছে, রোজায় সাড়ে ৩ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। চলতি বছরের আড়াই মাসে সয়াবিন তেল আমদানি হয় ১ লাখ ২১ হাজার টন। গত বছর একই সময় আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার টন।

তুষার স্টোরের জসিম উদ্দিন বলেন, দাম তো আমরা বাড়াই না। আমাদের দাম দিয়ে কিনতে হয়। তাই আমরা সেই দাম থেকে কিছুটা লাভ করে বিক্রি করি। টিসিবি’র হিসাবে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৬৮ থেকে ১৭২ টাকায়, যা গত বছর এ সময়ে ছিল ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা। ৫ লিটারের বোতল ৮৭০ থেকে ৮৮০ টাকা, ছিল ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা। ১ লিটারের বোতল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা, ছিল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। খোলা পাম অয়েলের লিটার ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। সুপার পাম অয়েল ১৪৫ থেকে ১৪০ বা তারও বেশি, ছিল ১৫৫ থেকে ১৫৮ টাকা।

বাজারে প্রতি কেজি ছোলা ৮৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর এ সময়ে ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এ ছাড়া বুটের ডাল-অ্যাংকর-পিয়াজুর ডাল বা মোটা ডালের কেজি ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে সাধারণ মানের প্রতি কেজি খেজুরের দাম ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা, যা গত বছর সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছিল ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। আর যে খেজুর গত বছর ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমান বাজারে সেই খেজুরের কেজি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারভেদে ব্রয়লার মুরগি গত সপ্তাহের মতো ২৪০-২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে অন্যান্য মুরগির দাম ২০-৫০ টাকা বেড়ে পাকিস্তানি মুরগি ৩৪০-৩৮০ টাকা ও বড় কর্ক মুরগি ৩২০-৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে দেশি মুরগির দাম এখন প্রতি পিস (৮০০-৯০০ গ্রাম) ৫০০-৫৫০ টাকা। পাশাপাশি গরুর মাংসও প্রতি কেজি বাড়তি দামে ৭৫০ টাকায় এবং খাসির মাংস প্রতি কেজি ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাংসের দাম নিয়ে এক ক্রেতা বলেন, শেষ কবে মাংস কিনেছি মনে নেই। সামনে রোজা তাই একটু দাম জানতে এসেছিলাম।

এদিকে বাজারে অন্যান্য পণ্যের মতো সবধরনের মাছের দাম বাড়তি। বাজারে পাঙাশ মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়, তেলাপিয়া আকৃতি ভেদে প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, চাষের কই প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকার ভেদে প্রতি কেজি রুই বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৫০০ টাকায়। দেশি জলাশয়ের মাছের দাম ৮০০-১০০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ইলিশ মাছ এক হাজার ৩৫০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর মালিবাগে সাজেদুর রহমান বলেন, বাজারে গরিবের মাছ হিসেবে যে পাঙাশ, তেলাপিয়া পরিচিত সেই মাছেরও অতিরিক্ত দামে ছোঁয়াও যাচ্ছে না।

মাছ বিক্রেতা আলী হোসেন বলেন, মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে মাছের চাহিদা বেড়েছে। তাই মাছের বাজারও একটু বাড়তি। মাছের দাম কেজিতে ন্যূনতম ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শান্তিনগর ও সেগুনবাগিচা বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি সজনে বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়, বরবটি ১০০-১২০ টাকা ও কচুরলতি ১০০-১৪০ টাকা। আর প্রতি কেজি করলা ৭০-৮০ টাকা, শিম ৫০-৬০ টাকা, পটল ৬০-৮০ টাকা, টমেটো ৪০-৫০ টাকা, বেগুন ৬০-৯০ টাকা, চিচিংগা ৬০-৮০ টাকা ও ঝিঙ্গা ৬০-৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বাজারে লাউ প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে আকার ভেদে ৫০-৮০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া প্রতি ফালি ২০-৪০ টাকা দরে। এদিকে দাম চড়েছে লেবুর। মান ভেদে লেবুর দাম হাঁকা হচ্ছে প্রতি হালি ৫০ থেকে ৮০ টাকা।

বাজারে আসা ক্রেতা হোসেন মিয়া বলেন, বেশিভাগ সবজির দাম ১০০-২০০ টাকা। ৫০-৬০ টাকার নিচে পেঁপে ছাড়া কিছুই নেই। এমন হলে সাধারণ মানুষকে না খেয়ে থাকতে হবে। শুধু সাদা ভাত খেতে হবে। সবজি বিক্রেতা এনামুল হক বলেন, শীতকালীন সবজি শেষ হয়ে যাওয়া এবং অনেক সবজির ক্ষেতে ধান লাগানোর কারণে উৎপাদন কমে গেছে। রোজা শুরু হলে বেগুন, শসা, লেবু, টমেটো ও ধনেপাতার দাম কিছুটা বাড়তে পারে।  কনজ্যুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি শামসুল আলম বলেন, সরকার জনগণকে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে ভোক্তার অধিকার রক্ষার বিষয় সরকারের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে।