ঢাকারবিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২৩
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাটি হয়ে গেল হাজারো পরিবারের ঈদের আনন্দ

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ১৬, ২০২৩ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ । ৫৪ জন
ছবি : সংগৃহীত

বঙ্গবাজারের পর আবারও মার্কেটে আগুন। এবার নিউ সুপার মার্কেটের প্রায় আড়াইশ দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বেশি বিক্রির আশায়, ঈদের আগে ধারদেনা করে দোকানে মালামাল তুলেছিলেন ব্যবসায়ীরা। আগুন তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন পথে বসার উপক্রম। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে ব্যবসায়ীরা যেমন দিশেহারা, তেমনি দিশেহারা দোকান কর্মচারীরাও। ঈদের মাত্র এক সপ্তাহ আগে শনিবার ভোরের ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মার্কেটের অন্য ব্যবসায়ীরাও। এখন তাদের মাঝে শুধুই হাহাকার।
নিউ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, এ মার্কেট দোকান মালিক, ব্যবসায়ী এবং কর্মচারীসহ ২০ হাজার মানুষের আয়ের উৎস। তাদের একেকজন মানুষের ওপর নির্ভরশীল একেকটি পরিবার। এই হিসাবে ভয়াবহ আগুনে ২০ হাজার পরিবারের ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে গেছে।

জানা গেছে, ঈদের আগে বেশি ক্রেতা সমাগম হয় নিউমার্কেট এলাকার মার্কেটগুলোতে। ঈদের মাত্র ১ সপ্তাহ আগে নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিদুর্ঘটনায় অনেকেই যেমন নিঃস্ব, তেমনি দিশেহারা অনেক মানুষ। নিউ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেন শনিবার বিকালে  বলেন, পুড়ে যাওয়া দোকানের সংখ্যা কত তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে আনুমানিক আড়াইশর কম হবে না। তিনি বলেন, প্রায় ১৩শ ব্যবসায়ী এবং দোকান কর্মচারীসহ ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান এ মার্কেটে। প্রতিটা দোকানে কম করে হলেও ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মালামাল রয়েছে। ঈদ টার্গেটে অনেকে আবার বাড়তি মালামালও তুলেছেন। হঠাৎ আগুনে নিঃস্ব করে দিল মার্কেটের কয়েকশ ব্যবসায়ীকে। তিনি জানান, রোববার তারা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করবেন, তখন বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

ঢাকা নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন শনিবার দুুপুরে যুগান্তরকে বলেন, এ অগ্নিকাণ্ডের কারণে নিউমার্কেট এলাকার সিটি করপোরেশনের চারটি মার্কেট এখন বন্ধ। এই চার মার্কেটে ৪ হাজার ব্যবসায়ী রয়েছেন। ঈদের আগের ১ সপ্তাহে তাদের প্রত্যেকের কমপক্ষে এক লাখ টাকা করে ব্যবসায় লাভ হতো। সেই হিসাবে দিনে ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি। আর যারা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
এদিকে নিউ সুপার মার্কেট এলাকায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের হাহাকার আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের পাশের ফুটপাতে বসে আহাজারি করছিলেন ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, নিউ সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় মেঘ বৃষ্টি গার্মেন্টস নামে তার দুটি দোকান ছিল। দোকান নং ৩১৭ ও ৩২৫। দুটি দোকানই পুড়ে গেছে। একটি মালামালও বের করতে পারেননি তিনি। তার দাবি, দুই দোকানে ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। আব্দুল হামিদ বলেন, শুক্রবার রাত ৩টা পর্যন্ত দোকান করেছি। এরপর দোকান বন্ধ করে মিরপুরের বাসায় যাই। সকালে খবর পাই মার্কেটে আগুন লেগেছে। এসে দেখি সব শেষ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভোর রাতে সিটি করপোরেশনের লোকজন ফুটওভার ব্রিজ ভাঙার সময় এ আগুনের ঘটনা ঘটেছে।

ব্যবসায়ী শামীম ও তার ভাইদের ৫টি দোকান পুড়ে গেছে। পানিতে ভেজা কিছু মালামাল তারা বের করতে পেরেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মালামালই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শামীম কথা বলতে পারছিলেন না। তার ভাই তানভীর  বলেন, ঋণ করে এনে গত রাতেও দোকানে ১০ লাখ টাকার মালামাল তুলেছি। আমাদের ব্যবসা মূলত ঈদের আগের ১ সপ্তাহই হয়। সারা বছর আমরা এ সময়টার অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু বিধিবাম। আগুন আমাদের কিছুই রাখল না।

নিউ সুপার মার্কেটের নোঙর গার্মেন্টসের মালিক শফিক রবিন। শুক্রবার রাতে ৬৫ হাজার টাকার মাল তুলেছিলেন দোকানে। তাছাড়া স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে সাড়ে ৫ লাখ টাকার মালামাল তুলেছিলেন দোকানে। আগুনে পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। রবিন বলেন, ‘রাতে ব্যবসা করে বাসায় পৌঁছার পর একজনের ফোনে ঘুম ভাঙল। আগুনের খবর পেয়ে দ্রুত এসে দেখি, আমি পথের ফকির। আমার আর কিছুই নেই। সব শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘গত রাতে দোকানে ২২ লাখ টাকার মতো ক্যাশ ছিল। কিছুই বের করতে পারিনি। প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’ তিনি জানান, তার দোকানে পাঁচজন কর্মচারীর একজনেরও বেতন-বোনাস দিতে পারেননি


নোয়াখালীর বাসিন্দা রাকিব হোসেন। প্রায় ২০ বছর আগে ঢাকায় এসে নিউ সুপার মার্কেটে দোকান কর্মচারীর কাজ নেন। চাকরির টাকা থেকে মাসে মাসে তিলে তিলে জমানো টাকা দিয়ে নিউ সুপার মার্কেটে একটি দোকান ভাড়া নেন। মার্কেটের ৩২০ নম্বর দোকান, নাম আলিজাজ কালেকশন। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা এবং সমিতির ঋণ নিয়ে দোকানে মালামাল তোলেন। নিউ মার্কেটের ৪ নম্বর গেটে দাঁড়িয়ে রাকিব বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, আমার ১৫ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। একটা মালও বের করতে পারিনি। তিনি বলেন, ক্যাশে ১ লাখ টাকা রাখা ছিল। সেই টাকাও পুড়ে গেছে। ৮ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। ঋণের টাকা কিভাবে পরিশোধ করবেন এ নিয়েও চিন্তিত রাকিব। নিউ সুপার মার্কেটের তিনতলায় একটি গোডাউন ছিল রাব্বী রহমানের। সেখানে মালামাল রাখতেন, আর ফুটপাতে দোকান খুলে বিক্রি করতেন। রাব্বী বলেন, রাত ৩টায় দোকান বন্ধ করে বাসায় যাই।

সকালে আগুনের খবর পেয়ে এসে দেখি, গোডাউনের সব মালামাল পুড়ে গেছে। একটি মালও আমি বের করতে পারিনি। রাব্বীর প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, তার মতো অন্তত ২০ জন ফুটপাতের দোকানির মালামাল পুড়ে গেছে।
নিউ সুপার মার্কেটের নিচতলায় চৌকি বসিয়ে বাচ্চাদের কাপড়চোপড় বিক্রি করতেন মজিবর রহমান। তিনি বলেন, আগুন নেভানোর সময় পানিতে ভিজে তার সব মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।
মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় তাসনিয়া ফ্যাশনের মালিক রুবেল মিয়া দোকান থেকে সরিয়ে আনা ভেজা মালামালেও ওপর বসে কাঁদছিলেন। তিনি জানান, দোকানের মালামাল বের করতে পারলেও গোডাউনের কাছেও যেতে পারেননি। গোডাউনে তার ৪০ লাখ টাকার মালামাল রয়েছে। সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

মার্কেটের নিবিড় ফ্যাশনের কর্মচারী মাসুদ বলেন, এমন সময় আগুনটা লাগল আমার মতো কয়েক হাজার কর্মচারীর কপাল পুড়ল। তিনি বলেন, মার্কেটের নিচতলায় আমার মালিকের দোকান। এখানে আমরা ৬ জন কর্মচারী। আগুনের খবর পেয়ে মালামাল বের করে মালিকের কামরাঙ্গীরচরের বাসায় রেখে এসেছি। ঈদের মাত্র ১ সপ্তাহ বাকি। এখনতো এমন অবস্থা। মালিকের কাছে বেতন-বোনাস চাইতে পারব না। ব্যবসা করতে না পারলে মালিক দেবে কোথা থেকে। মাসুদ বলেন, আগুন আমার মতো কয়েক হাজার কর্মচারীর কপাল পুড়ল। আমরা প্রতিবছর বেতন-বোনাসের পাশাপাশি চাঁদরাতে অগ্রিম টাকাও নিয়ে যেতাম। এবার তো আর কিছুই থাকল না। ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, গতকালও কোটি টাকার মালামাল ছিল দোকানে। আজ কিছুই নেই, সব শেষ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মাহবুবুর রহমানের ৪টি দোকানের সব মাল পুড়ে গেছে।
৪ এপ্রিল সকাল ৬টা ১০ মিনিটে বঙ্গবাজারে আগুন লাগে। এতে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের বঙ্গবাজার মার্কেট, মহানগর মার্কেট, আদর্শ মার্কেট ও গুলিস্তান মার্কেটের সব দোকান পুড়ে যায়। পাশের এনেক্সকো টাওয়ার, বঙ্গ ইসলামীয়া ও বঙ্গ হোমিও মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। ফায়ার সার্ভিসের ৪৮টি ইউনিটের প্রচেষ্টায় ওইদিন দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও এর ৭৫ ঘণ্টা পর আগুন পুরোপুরি নেভাতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা এখন চৌকি পেতে ব্যবসা শুরু করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে শনিবার ভোর পৌনে ৬টায় আগুন লাগে নিউ সুপার মার্কেটে। প্রায় ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ২৮টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আগুন নির্বাপণের কাজ চলমান রয়েছে।