ঢাকাশনিবার , ১১ মার্চ ২০২৩
  • অন্যান্য

দেশের ৬২ হাজার ৬৫৬টিরও বেশি পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১১, ২০২৩ ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ । ৬৩ জন
ছবি : সংগৃহীত

করোনা মহামারির পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের ৬২ হাজার ৬৫৬টিরও বেশি পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ৯৫ হাজার ৫২৩টি খামার উৎপাদনে রয়েছে। এর প্রভাবে বছরে মুরগির উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ২৭৩ টন থেকে কমে ৪ হাজার ২১৯ টনে নেমেছে। অর্থাৎ মাংসের উৎপাদন কমেছে ২৫.৭১ শতাংশ। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সমিতির তথ্যমতে, পোল্ট্রি শিল্পের খাদ্য তৈরির উপকরণ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে না পারলে আগামী দিনে আরও খামার বন্ধ হয়ে যাবে। এবং বাজারে ডিম ও মুরগি সরবরাহে সংকট আরও বাড়বে। কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন কয়েক লাখ কর্মজীবী মানুষ।

এসোসিয়েশনের তথ্যে বলা হয়, ডিম ও মুরগির মাংসের খুচরা দাম নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন খামারিরা ভালো দাম না পাওয়ার কারণে খামার বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রভাবে প্রতিদিনের মুরগির মাংসের উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। একইভাবে ডিমের উৎপাদন দৈনিক ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৮২ হাজার পিস থেকে কমে ৪ কোটি ৩২ লাখ ১৩ হাজার ৪১৮ পিসে নেমেছে।

অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে ২৫ ভাগ। অথচ বিয়ে শাদি, পিকনিকসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের কারণে মুরগি ও ডিমের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এই সরবরাহ না থাকার কারণেই বাজারে ডিম ও মুরগির দাম বাড়ছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ হচ্ছে ১৬৭ টাকা, যেখানে খামারি বিক্রি করছে ১৯০-২০০ টাকায়। ঢাকার বাজারে এই মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা পর্যন্ত। বাড়তি দামের কারণে খামারিরা দীর্ঘদিন পরে লাভের মুখ দেখলেও এই দামটা স্বাভাবিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ হচ্ছে ১১.৭১ টাকা, যেখানে খামারি লোকসান দিয়ে বিক্রি করছে ৯.৪৫ টাকায়। ডিমে খামারিরা লোকসান গুনছেন এবং এটাও স্বাভাবিক দাম নয়।

এসোসিয়েশনের মহাসচিব খন্দকার মো. মহসিন বলেন, খামারিদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে ১০-১৫ টাকা এবং প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচের সঙ্গে ২৫-৫০ পয়সা পর্যন্ত লাভ রেখে বিক্রির অবস্থা তৈরি করতে পারলে খামারিরা লাভে থাকবে এবং বাজারেও যৌক্তিক দামে মুরগির মাংস ও ডিম বিক্রির পরিবেশ ফিরে আসবে।

পোল্ট্রির ডিম ও মাংস উৎপাদনে ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। আর এ খাদ্যের বেশির ভাগ উপাদানই আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। আমদানির জন্য আগে যে ডলার ৮৪ টাকায় কেনা যেতো, এখন প্রতি ডলারের জন্য ১১০ টাকা দিতে হচ্ছে। তারপরও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে করোনা পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মুরগির বাচ্চা, ফিডের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, ডিজেল, বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ সবকিছুরই দাম বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে এসব কারণেই।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির আরও উদাহরণ দিতে গিয়ে সংগঠনটির মহাসচিব খোন্দকার মো. মহসিন জানান, ২০২০ সালের মাঝামাঝি প্রতি কেজি ভুট্টার দাম ছিল ১৭.৩০ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি শুকনা ভুট্টার দাম ৩৮ টাকার বেশি। পোল্ট্রি খাদ্যে ভুট্টার ব্যবহার হয় ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া পোল্ট্রি খাদ্যে সয়াবিন খইলের ব্যবহার শতকরা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। যে সয়াবিন খইলের দাম ২০২০ সালে প্রতি কেজি ছিল ৩৫ টাকা, বর্তমানে তা ৮৪ টাকার বেশি। মহসিন বলেন, দীর্ঘদিন লোকসানের কারণেই অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। তবে দাম নির্ধারণ করে দিতে পারলে ভবিষ্যতে খামারিরা সংকটে পড়বে না। বাজারে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব খন্দকার মো. মহসিন জানান, ৮৪ শতাংশ উৎপাদন ক্ষুদ্র খামারিদের নিয়ন্ত্রণে। মাত্র ১৬ ভাগ উৎপাদন রয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল খামারিদের কাছে। ক্ষুদ্র খামারিদের পক্ষে সারা দেশে এক হয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই।

এদিকে গত বৃস্পতিবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায় পোল্ট্রি এসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার অভিযোগ করেন, ব্রয়লার মুরগির বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয় এক অদৃশ্য এসএমএসের মাধ্যমে।

একই সভায় ব্রয়লার মুরগি ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রতি কেজি মুরগি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনে খরচ হয় করপোরেট পর্যায়ে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। তবে খুচরা খামারি পর্যায়ে এই খরচ হয় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।

ব্রিডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) সভাপতি ও কাজী ফার্মস লিমিটেডের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ বাড়ায় অধিকাংশ ছোট খামারি ক্ষতিতে পড়েছে। অনেকে খামার বন্ধ করে রেখেছে এবং বাচ্চা কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির জন্য কী পরিমাণ খরচ হয়, জানতে চাইলে কাজী জাহিন হাসান বলেন, খুচরা খামারি পর্যায়ে এই খরচ হয় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। তবে আমরা যারা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মুরগির উৎপাদন করি, তাদের ২০ টাকার মতো কমে খরচ হয় ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সিন্ডিকেট, করপোরেট গ্রুপ ও অদৃশ্য যে এসএমএসের কথা বলা হচ্ছে, আমরা তা খতিয়ে দেখবো। আমাদের কাছে আগেও এই বিষয়গুলো এসেছে। তিনি বলেন, ১৪০ টাকার মুরগি কেন ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।