fgh
ঢাকাবুধবার , ৬ মে ২০২৬
  • অন্যান্য

অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ

অনলাইন ডেস্ক
মে ৬, ২০২৬ ১:১০ অপরাহ্ণ । ৩ জন

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় রিকশার প্যাডেলে ঘুরছে জীবিকার চাকা, আর একই সময়ে মোবাইলের পর্দায় নিঃশব্দে গড়ে উঠছে সর্বনাশের ফাঁদ। ফাঁদটা একই- শুধু মুখগুলো আলাদা। কোথাও ‘লাকি স্পিনে’ উধাও হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টকর্মীর মাসকাবারি বেতন, কোথাও দিনের আয়ের টাকা মিলিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি ট্যাপে।

অল্প পুঁজিতে দ্রুত লাভের মোহ, ‘আজ হারলে কাল জিতব’- এই মনস্তত্ত্বই টেনে নিচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষদের এক অদৃশ্য জুয়ার জালে, যেখান থেকে বের হওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

রাজধানী থেকে মফস্বল- সবখানেই একই চিত্র। রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর কিংবা গার্মেন্টকর্মী- জীবনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন এই ভার্চুয়াল জুয়ার দিকে।

বাস্তবের কষ্টকর আয়ের বিপরীতে ‘পাঁচ মিনিটে তিনগুণ’ লাভের প্রলোভন তাদের কাছে হয়ে উঠছে এক ধরনের স্বপ্নের শর্টকাট। কিন্তু এই স্বপ্নই পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। একবার জেতার পর লোভ বাড়ে, আর হারলেই ফেরত পাওয়ার আশায় বাড়তে থাকে বাজি; যার শেষ পরিণতি প্রায় সবক্ষেত্রেই নিঃস্বতা।

গত এপ্রিলের শেষ শুক্রবারের এক বিকাল। ঢাকার ফার্মগেট থেকে তেজগাঁও গিয়ে ভাড়া দেওয়ার সময় এক অদ্ভুত অনুরোধ করেন রিকশাচালক করিম মিয়া। তিনি ভাড়ার ৫০ টাকার নোট নেওয়ার বদলে বিকাশে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কৌতূহলী হয়ে যাত্রী মাহমুদ হাসান কারণ জানতে চাইলে চালক বলেন, তার বিকাশ একাউন্টে ৪৫০ টাকা আছে; আর ৫০ যোগ হলে ৫০০ টাকা পূর্ণ হবে।

রিকশাচালকের একাউন্টে টাকা পাঠানোর পর সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি অন্য একটি একাউন্টে পুরো টাকা পাঠিয়ে দেন। টাকা পাঠানোর পর ফোনে চালককে বলতে শোনা যায়, ‘৫০০ টাকা দিলাম, তুমি বলছিলা শুক্রবার দিলে বোনাস পাব।’

কৌতূহল আরও বাড়ে মাহমুদ হাসানের। ৫০ টাকা বিকাশের নেওয়ার জট খুলতে চালকের সঙ্গে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কথা শুরু হয় মাহমুদের। ৩৮ বছর বয়সী চালক করিম মিয়া তাকে জানায়, স্ত্রী, দুই মেয়ে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তার ছোট সংসারের বসবাস ঢাকার মালিবাগে। দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে আয় হাজার টাকার কাছাকাছি। সেই আয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই সংসার চলছিল। মাস ছয়েক আগে অপর রিকশাচালকের মাধ্যমে পরিচয় হয় একটি মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে।

তার কথামতো ‘মাত্র ১০০ টাকা লাগাও, ৫ মিনিটে ৩০০ টাকা’ বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে প্রথম দিনই লাভ হয়। করিম মিয়ার কাছে সেটি আলাদিনের চেরাগের মতো। প্রথম দিনের লাভের পর শুরু হয় পতনের গল্প। একবার জিতলে লোভ বাড়ে, হারলে ফেরত পাওয়ার আশায় আবার বাজি ধরে। অল্প সময়ের মধ্যেই রিকশার দৈনিক আয়ের প্রায় পুরোটাই চলে যেতে থাকে জুয়ার অ্যাপে।

এরপর হাত দেন সঞ্চয়ের ৫ হাজার টাকায়। তবে নিমিষেই সেই টাকাও শেষ। বারবার চেষ্টা করেও তিনি এই নেশার ফাঁদ থেকে বের হতে পারেননি। এখনও নিয়ম করে প্রতিদিন ১০০ টাকা জুয়ায় ঢোকান। মাথায় শুধু ঘোরে আরেকটা বাজি ধরলে হয়তো সব ফেরত পাবেন।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান আমাদের সময় বলেন, সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের দিনের ২৪ ঘণ্টাই জুয়ার সাইট শনাক্তে কাজ করছে। শনাক্ত হওয়া জুয়ার সাইটগুলোর তালিকা তৈরি করে বিটিআরসিকে লেখা হয়। বিটিআরসি থেকে জুয়ার সাইটগুলো বন্ধ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, মামলা হলে কিংবা অভিযোগ পেলেও সিআইডি জুয়ার সাইটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এ ছাড়া জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের নিয়মিত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বর্তমানে জুয়ার আইনেও কড়াকড়ি করা হয়েছে। জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধীর দুই বছরের জেল কিংবা এক কোটি টাকা জরিমারা বা উভয় দণ্ডই হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অল্প পুঁজিতে লাখপতি’ কিংবা ‘দ্রুত আয়’-এর মতো বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে ফাঁদে পড়ে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ ঝুঁকছে অনলাইন জুয়ার দিকে। রিকশাচালক, গার্মেন্টকর্মী, সবজি বিক্রেতা, চা-দোকানির মতো নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি আসক্ত হচ্ছেন জুয়ার নেশায়। অল্প আয়ের টাকা কয়েকগুণ বাড়ানোর আশায় তারা জড়িয়ে পড়ছেন এমন এক খেলায়, যেখানে জেতার চেয়ে হারার শঙ্কাই বেশি। ফলে অনেকেই হারাচ্ছেন শেষ সম্বলটুকুও; ভেঙে পড়ছে পরিবার, তৈরি হচ্ছে নতুনএক সামাজিক সংকট।

পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনলাইন জুয়ায়। হাজারীবাগের ২৭ বছর বয়সী গার্মেন্টকর্মী সুমাইয়া রংপুর থেকে ভাগ্যবদলের আশায় একা ঢাকায় আসেন। মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন গার্মেন্টে; ওভারটাইমসহ আয় দাঁড়ায় ১৫-১৬ হাজার টাকা।

এর মধ্যে ৭ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে বাকি দিয়ে নিজের খরচ ভালোভাবেই চলছিল। একদিন ফেসবুকে চোখে পড়ে একটি বিজ্ঞাপন ‘ঘরে বসে আয় করুন, দিনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা গ্যারান্টি।’ কৌতূহলবশত ক্লিক করতেই সেটি তাকে নিয়ে যায় একটি গেমিং সাইটে। শুরুতে বিনামূল্যে খেলার সুযোগ, এরপর অল্প বিনিয়োগে বড় জয়ের প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন সুমাইয়া। প্রথমদিকে কিছু লাভও করেন। সেই টাকা দিয়ে ভালো একটি মোবাইল ফোনও কিনেছিলেন। জীবন যেন নতুন ছন্দে এগোচ্ছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। আস্তে আস্তে হারতে থাকেন জুয়ায়। এরপর মাসের মাঝামাঝিতেই বেতনের বড় অংশ শেষ হয়ে যেতে থাকে। একসময় বাড়িতে টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসাও। সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেন, কিন্তু সেই টাকাও হারেন। পরে মোবাইল ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঋণ নেন।

চলতি মাস থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার পর তার হাতে থাকবে মাত্র দুই হাজার টাকা। মাত্র দুই হাজার টাকা কীভাবে তিনি মাস চালাবেন জানেন না।

অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। জিগাতলার বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই ছিল ৩৪ বছর বয়সী মুইন মিয়ার পরিবারের একমাত্র সম্বল। দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করে মোটামুটি চলছিল তার সংসার।

একদিন দোকানে চা খেতে আসা এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ তাকে দেখায় কীভাবে ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরে অল্প সময়েই হাজার টাকা আয় করা যায়। চোখের সামনে ওই তরুণকে কয়েকবার জিততে দেখে শেষ পর্যন্ত লোভ সামলাতে পারেননি। এরপর ছোট-ছোট বাজিতে কয়েকবার জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়লে বড় বাজি ধরা শুরু করলে পতনের শুরু হয়।

হারার পর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার আরও বড় বাজিতে হারতে থাকেন। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দোকানের পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যায়। এখন দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এইবার ফেরত পাব- এই চিন্তাটাই জুয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ। একে বলা হয় ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’। এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে সর্বস্ব হারানো শুধু সময়ের ব্যাপার।

কারওয়ানবাজার থেকে ভোরে মালামাল নিয়ে মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজারের বিক্রি করেন তরুণ ব্যবসায়ী আলিফ। মাস কয়েক আগে বাজারেরই এক পরিচিত ব্যক্তি মোবাইলের একটি অ্যাপ দেখিয়ে বলল, ‘ক্রিকেট ম্যাচে ১০০ টাকা লাগাও, জিতলে ২৫০ পাবা।’ প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলেও কৌতূহল আর প্রলোভনে সেদিন সন্ধ্যায় ১০০ টাকা বাজি ধরে ২২০ টাকা পান। তার কাছে মনে হয়, সারাদিন রোদে পুড়ে যা আয় হয়, এখানে তা মিনিটেই সম্ভব। এরপর কৌতূহল আর লোভ থেকে রূপ নেয় অনলাইন জুয়ার নেশায়। কয়েক মাসের নেশায় আলিফ ব্যবসা হারিয়েছে, সেই সঙ্গে হারিয়েছে স্বপ্ন।

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে প্রথম দিকে জেতায়। এটাকে বলা হয় ‘লোয়ার দ্য গার্ড’ কৌশল। একবার আসক্তি তৈরি হলে অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো থাকে যে দীর্ঘমেয়াদে জেতা প্রায় অসম্ভব।

জুয়া বাংলাদেশে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন আর বাস্তবতার মাঝে রয়ে গেছে একটি বড় ফাঁকি এবং সেই ফাঁকিটা তৈরি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে পরিচিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে। পরিচিত এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলোই এখন অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার দেশি এজেন্টরা কৌশলে এমএফএস-এর এজেন্ট নম্বর নেয়। সেই এজেন্ট নম্বরগুলো জুয়ার অ্যাপের ভেতরে যুক্ত করে দেওয়া হয় ডিপোজিটের মাধ্যম হিসেবে। ব্যবহারকারী জুয়ার টাকা সরাসরি চলে যায় এসব এজেন্ট নম্বরে। কাগজে-কলমে মনে হয় একটি সাধারণ দোকানে টাকা যাচ্ছে।

তবে লেনদেনের ধরনই বলে দেয় সত্যিটা। এই এজেন্ট নম্বরগুলোয় বেশিরভাগ লেনদেন হয় ২০০, ৩০০ বা ৫০০ টাকার; যা নিম্ন আয়ের জুয়াড়িদের সাধ্যের মধ্যে। ক্যাশ-আউট হয় কম, ক্যাশ-ইন হয় বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই লেনদেনের বড় অংশই হয় রাত ১১টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত।

অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় সব এজেন্টের দোকান রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিগুলো জেনে বুঝেও এসব এজেন্ট নম্বর বন্ধ করে না। এই নীরবতা অজ্ঞতার নয়, এটা অনৈতিক আয়ের নীরব সম্মতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন জুয়া বন্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবাই এই নেশা থেকে বের করে আনতে পারে। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে প্রতিদিন আরও অনেক করিম, সুমাইয়া আর আলিফ দ্রুত ধনী হওয়ার ফাঁদে পা দেবেন এবং নিঃস্ব হবেন।