fgh
ঢাকাবুধবার , ১ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে সরকারকে দূরদর্শী ও সতর্ক থাকতে হবে

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ১, ২০২৬ ১২:২৫ অপরাহ্ণ । ২ জন

মৌরিশাসের পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে’ যোগ দেয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ৭ ও ৮ এপ্রিল দুদিনের সফরে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভারতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি প্রথম সফর। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির তার সফরসঙ্গী হওয়ার কথা রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া (১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর চুক্তি হয়) গঙ্গা চুক্তি ও পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়, সীমান্ত হত্যা, বাংলাদেশে ভারতীয়দের পুশইন, দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনাসহ পারস্পরিক সমঝোতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া নিয়ে আলোচনা হবে বলে গতকাল দৈনিক ইনকিলাবসহ অন্যান্য দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সফরের প্রথম দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বৈঠক হবে। এছাড়া ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়কমন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরিসহ ভারত সরকারের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে।

দুই দেশই নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষনার পর থেকে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত বেশ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর সে সময়ের বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাতে দিল্লী থেকে ছুটে আসেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে অফিসিয়ালি ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে যে ভারত মুখিয়ে রয়েছে, আগ বাড়িয়ে এসব কার্যক্রম শুরু করা থেকে তা বোঝা যায়।

বাংলাদেশও তাতে ইতিবাচকভাবে সাড়া দিয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের এপ্রিলে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহ গত ২০ মার্চ প্রথমবারের মতো ভারতের দুই মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল। তার আগে ১ থেকে ৩ মার্চ ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক প্রথমবারের মতো ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে যান।

গণঅভ্যুত্থানে পতিত ও পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেড় দশকে ভারত বাংলাদেশের সাথে কী ধরনের আচরণ করেছে, তা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখে এবং তাকে দিয়ে দেশের মানুষকে দমিয়ে ভারত কীভাবে তার সব চাহিদা ও স্বার্থ আদায় করে নিয়েছে, তা জনগণ ভালোভাবে জানে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বলতে কিছু ছিল না।

হাসিনাকে দিয়ে ভারত বাংলাদেশকে তার করদ রাজ্যে পরিণত করে রেখেছিল। জনগণের মনে ভারতের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে গণঅভ্যুত্থানে। এতে হাসিনার পতন হয় এবং তিনি পালিয়ে ভারতেই আশ্রয় নেন। হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া নিয়ে জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের এই মনোভাব ধারণ করে ভারতকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় দেয়নি। ভারতও বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সীমিত বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাসহ ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয়। ভারতের তার মিডিয়াগুলো বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় মেতে উঠে।

গোয়েবলসিয় কায়দায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভুয়া ও মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ভারত সরকারও বিভিন্ন সময়ে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধোঁয়া তুলে দেশটির উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দিল্লী, কলকাতা, আগরতলাসহ অন্যান্য রাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশন ও উপ হাইকমিশনে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারকে ফেলে দিতে আওয়ামী দোসরদের দিয়ে নানা ষড়যন্ত্র করে। ভারত তার নাগরিকদের বাংলাদেশী বলে পুশইনসহ সীমান্ত হত্যা বৃদ্ধি করে।

দুই দেশের সম্পর্ক ‘সাপে নেউলে’ পর্যায়ে পৌঁছে। এমন এক চরম বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক থেকে নতুন সরকারের সাথে ভারত নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এতে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থই বেশি জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সাথে যোগাযোগ এবং বিচ্ছিন্নতার ভয়সহ বাংলাদেশে তার বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশেরও ভারতের কাছে স্বার্থ রয়েছে। অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, তিস্তাচুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ করা, বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে, তলানিতে গিয়ে ঠেকা দুই দেশের পারস্পরিক সমতা ও মর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আমরা বরাবরই বলে এসেছি, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে, সমতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে।

অথচ ভারত বাংলাদেশকে কখনোই এই দৃষ্টিতে দেখেনি। সে বরাবরই দাদাগিরির দৃষ্টিতে দেখেছে। সে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে তার পুতুল বানিয়ে বাংলাদেশকে অঙ্গরাজ্যের মতো ব্যবহার করেছে। হাসিনাও ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে তুচ্ছ করে ভারতের সব চাওয়া পূরণ করেছে। বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে কিছুই দেয়নি। শেষ পর্যন্ত দিল্লীর দাসে পরিণত হওয়া হাসিনাকে গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যেতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ভারতের আধিপত্য ও আগ্রাসী আচরণ থেকে মুক্ত হয়। এক নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু হয়। নতুন বাংলাদেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার। সঙ্গতকারণেই নতুন সরকারকে ভারতের সাথে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আগে দেশের স্বার্থ দেখবে। ভারতের কাছ থেকে দেশের স্বার্থের ষোলআনা বুঝে নেবে। জনগণের মতের বাইরে যাবে না। দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে জনস্বার্থকেন্দ্রিক। এর ব্যতিক্রম হলে, দেশের মানুষ সরকারকে ক্ষমা করবে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র।

তার উপর ভারত মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। ফলে সরকারকে ভারতের সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে, ভারত এক হাতে ছুরি লুকিয়ে অন্য হাতে ফুল দিচ্ছে কিনা। কারণ, ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্তই বলেছেন, শেখ হাসিনাকে যদি ভারত ক্রমাগত আশ্রয় দিয়ে যেতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যামান ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়বে বৈ কমবে না।

সুতরাং ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের এই মনোভাব কমানোর দায়িত্ব ভারতের। তাকে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা ও ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে হবে। শুল্ক বাধা দূর করে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে হবে। তার দাদাগিরি ও আগ্রাসী মনোভাব পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। তাহলে, হয়ত বাংলাদেশের মানুষের ভারতবিরোধী

নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিবিসি বাংলার সাথে দুই পর্বের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ভারতের সাথে সম্পর্ক বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আগে আমার দেশের স্বার্থ দেখা হবে। সবার আগে আমার স্বার্থ রক্ষা করে সকলের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। তার এই বক্তব্য সে সময় ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানও জনগণের মধ্যে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পায়। ভারতসহ প্রত্যেক দেশের সাথে এই শ্লোগানের ভিত্তিতে হবে, বিএনপি সরকারের কাছে দেশের মানুষ এমন প্রত্যাশাই করে। কারো সাথে শত্রুতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্বÑএই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেই এগিয়ে যেতে হবে। তবে ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে সরকারকে দূরদর্শী হতে হবে। পারস্পরিক সমতা, স্বার্থ, সম্মান ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে হবে। ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় ও তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।

সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ করার গ্যারান্টি আদায় করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে যে বিপুল ব্যবধান, তা ভারসাম্যের মধ্যে আনতে হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত বাংলাদেশে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে সমতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য যে ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি রয়েছে, তা থেকে কীভাবে ম্যক্সিমাম বা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রেভিনিউ আদায় করা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের সাথে এমন সম্পর্কে যেতে হবে, যাতে দেশ ও জনগণ সরাসরি উপকৃত হয়। আমরা আশা করি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষা করে দেশে ফিরবেন।