fgh
ঢাকাশনিবার , ৯ মে ২০২৬
  • অন্যান্য

আমরা আলোকিত মানুষ চাই-ই

অনলাইন ডেস্ক
মে ৯, ২০২৬ ৪:০০ অপরাহ্ণ । ২ জন

মামুনুর রশীদ

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ১১:০

আমাদের দেশে সুদূর অতীত থেকে কিছু ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন এবং তারা ব্যক্তি হিসেবে সমাজে বড় বড় সংস্কারকাজ করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা বলা যায়। তিনি বিধবাবিয়ে, বাল্যবিয়ে, নারীশিক্ষাসহ নানা সংস্কারকাজে মনোযোগী হয়েছিলেন এবং এটি ভেবেছিলেন যে শিক্ষার বড় ধরনের সংস্কার না হলে বাঙালি জাতি কোনো দিনই মানুষ হবে না। রবীন্দ্রনাথও তা-ই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সেই বিদ্যাসাগরকে নানাভাবে চরিত্র হনন, কুৎসা এবং কোণঠাসা করার বড় বড় পরিকল্পনা করেছিল বাংলার ব্রাহ্মণ ও তথাকথিত কুলীন সমাজ।

শুধু বিদ্যাসাগর নন, তাঁর মতো অনেককেই এ রকম সংকটে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু তখন তা হয়েছিল জনশ্রুতির মাধ্যমে আর সীমাবদ্ধ ছিল কিছু পত্রপত্রিকায়। শেষ বয়সে কলকাতার সমাজ ত্যাগ করে এক আদিবাসী গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। এ রকম নানাভাবে আক্রান্ত মানুষজনকে আমরা দেখেছি, যারা সংস্কারের কাজে এগিয়ে এসেছেন।

সম্প্রতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে নানান ধরনের লেখালেখি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ষাটের দশক থেকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অধ্যাপনার পাশাপাশি মুক্তচিন্তার কাজগুলো করছিলেন। দুটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেছেন অনেক কায়ক্লেশে, যা ছিল সৃজন ও রুচির দিক থেকে খুবই উচ্চমানের। প্রতিষ্ঠা করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ইন্দিরা রোডে একটি ছোট্ট বাড়ি ও তার বারান্দা নিয়ে এর শুরু এবং প্রথম থেকেই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল–মানুষকে বই পড়াতে হবে।

পাঠাভ্যাস একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা মনুষ্যত্বের প্রধান উপাদান। বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী, যুবক-প্রবীণ যুক্ত হয়, পাশে থাকে। কিছু উদ্যমী মানুষও তাঁর এই আহ্বান শোনেন এবং বাংলামোটরে একটি স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য চেষ্টা করেন।

যেহেতু তিনি অধ্যাপক এবং জনপ্রিয় মানুষ, তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে একটি স্থায়ী কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা। এর মধ্যে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এবং চাকরিজীবী ও ব্যবসারত তরুণদের যুক্ত করে তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করেন; সঙ্গে একটা বড় লাইব্রেরি, যেখানে তিনি বিশ্বসাহিত্যের নানা অনুবাদ এবং বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয় সাহিত্য পাঠের ব্যবস্থা করেন।

এর মধ্যেই তিনি সংযোজন করেন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি; গাড়িতে করে বই-পুস্তক শুধু শহরে নয়, মফস্বল ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দেন। একেবারে গবেষণা করে বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্য কী ধরনের বই পাঠ করা যেতে পারে তারও ব্যবস্থা করেন। এরপর বই পড়ার জন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও করেন।

প্রতিবছর ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে এ প্রতিযোগিতা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের পুরস্কারের জন্যও বড় বড় আয়োজন করা হয়। আমি নিজেও এসব আয়োজনে অংশ নিয়েছি এবং দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির অনেক প্রভাবশালী মানুষকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য তিনি নিয়েও এসেছেন। এই বিপুল কর্মকাণ্ডে তাঁর সাংগঠনিক শক্তি ও প্রাণশক্তি বিস্ময়কর। তাঁর একটি কথা ক্রমাগতই জনপ্রিয় হতে থাকে, তা হলো–‘আলোকিত মানুষ চাই’। আমরা চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই আমাদের সমাজ এক অন্ধকারের মধ্যে নিক্ষিপ্ত।

শিক্ষা যখন স্বশিক্ষায় রূপান্তরিত হয় তখনই আলোকিত মানুষের জন্ম হয়। রবীন্দ্রনাথ কখনও বিদ্যালয়ে যাননি। কিন্তু তিনি স্বশিক্ষিত ছিলেন। তিনি প্রয়োজনে, আনন্দে শিক্ষাকে গ্রহণ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম তেমন বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাননি, তিনিও তাঁর তৃষ্ণা থেকে বিশ্বসাহিত্যকে আত্মস্থ করেছেন। আরও যারা বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সমাজে বাংলা ভাষায় অবদান রেখেছেন, প্রত্যেকেই উপলব্ধিতে শিক্ষার কথা বলেছেন; শুধু স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই নয়, অপাঠ্য বইয়ের কথাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই আয়োজনের পেছনে সরকারের অর্থ আছে। রাষ্ট্রের সম্পদের অনেক অপচয়ের মধ্যে আমরাও চাই সংস্কৃতির জন্য, মানুষের বোধ সৃষ্টির জন্য আলোকিত মানুষ তৈরিতে একটা বড় অর্থের সুদূরপ্রসারী লগ্নি। এই লগ্নি ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনার জন্য একটি সুষ্ঠু অবস্থার সৃষ্টি করুক। মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর শাসনকালে নানা জায়গায় তরুণদের বলেছেন দেশে এন্টারপ্রেনিউর (শিল্প উদ্যোগী) সৃষ্টি করার জন্য।

তাঁর জানা উচিত জাপানের মতো শিল্পপ্রধান দেশেও উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শতভাগ শিক্ষিত মানুষ তৈরির জন্য মেইজি রিফরমেশন করতে হয়েছে। শিল্পের উদ্যোগও সুশিক্ষিত মানুষের হাতে পড়তে হয়, তা না হলে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ে–যেমনটি আমাদের হয়েছে। লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের প্রবণতা দেশকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে। অর্থ উপার্জন সহজ কাজ নয়, তার ব্যয়ও সহজ নয়। এসব বিষয়ে একটা মানুষের দিকনির্দেশনা আসে শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে। যে বিষয়টি এখনও রাজনীতিকদের কাছে উপেক্ষিত।

আমরা বহু কায়ক্লেশে দেশে একটি নাট্যচর্চা গড়ে তুলেছি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই শিল্পকে অনেকাংশে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তথাকথিত শিক্ষিত, শিক্ষক, চাকরিজীবী, ছাত্র, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বড় অংশ নাটক দেখেন না, সিনেমা হলে যান না, সংগীত অনুষ্ঠান ও চারুকলার প্রদর্শনীতে আসেন না, উচ্চাঙ্গসংগীতের নিয়মিত চর্চা নেই।

স্ব-উদ্যোগে কিছু প্রতিষ্ঠান সারাদেশে সংগীতের আয়োজন করে থাকে। সংগীতচর্চা এখন অনেকাংশেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশাল মুসলিম সম্প্রদায় এসব শিক্ষা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এটাই উপলব্ধি করেছিলেন যে অনেক নৈরাজ্য এবং অন্ধত্ব থেকে মানুষ মুক্তি পেতে পারে পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে।

আলোকিত মানুষ সুদূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। আমরা

কখনও তাৎক্ষণিকতাকে বিশ্বাস করে ভুল করে থাকি। সেই ভুল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদেরও হতে পারে। কারণ তিনি দেবতা নন। ৫ আগস্টের পরে তিনি যদি বলে থাকেন–আমরা মুক্তি পেয়েছি। এটি একটি ক্ষণিকের ভ্রান্তিও হতে পারে, যেমনটা অনেক মানুষের মাঝে হয়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় আলোকিত রাজনীতিবিদদের ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

বিদেশি সাহায্যপুষ্ট বেসরকারি সংস্থাগুলোর জ্ঞান যে কত খণ্ডিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত ১৮ মাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা সমগ্র জাতিকে এক উদ্দেশ্যহীনতা এবং উদ্যমহীনতায় নিয়ে গেছে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুবার আমাদের বলেছেন, রাজনীতি একটা বড় ধরনের সংস্কৃতি। একজন রাজনীতিবিদ নানা ধরনের টানাপোড়েন ও মানুষের সীমাহীন সমস্যার মধ্য থেকে নির্যাতিত হয়ে জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসেন। তাঁরও যে ভুলভ্রান্তি থাকে না তা নয়; মানুষ তাঁর কাছে গিয়ে আশ্রয় পায়। কখনও কখনও সঠিক রাজনীতিবিদ যুক্তির বাইরে চলে যান,

তবুও এটাই প্রক্রিয়া। সঠিক রাজনীতিটাকে আবিষ্কার করতে গেলে অনেক ভুল বিষয় জনগণ পেয়ে থাকে, যা বিভ্রান্তিকর। এসবের জন্য আলোকিত মানুষের প্রয়োজন। যাকে-তাকে যেখানে-সেখানে ট্যাগ দিয়ে দেওয়ার মোক্ষম জায়গাটি হচ্ছে ফেসবুক পেজ। ফেসবুকে যে অনেক জরুরি বিষয় আমাদের আলোকিত করে না তা নয়। তবে যে প্রবণতার কথা বলেছি, তা যদি পরিহার করা যায়, যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে যদি আমরা পরিচালিত হই, তাহলে প্ল্যাটফর্মটি হতে পারে জনকল্যাণমুখী। সব শেষে আমরা আলোকিত মানুষ চাই-ই, যারা এই কাজটি ভবিষ্যতে সম্পন্ন করবেন। মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব