হিশাম সাফিদ্দিন
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২০
এই সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের দ্বিতীয় দফা সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গত ১৪ এপ্রিল প্রথম দফার আলোচনার পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ‘স্থায়ী শান্তির অনুকূল পরিস্থিতি’ তৈরির লক্ষ্যে ১০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে একটি বিবৃতি দিয়েছিল।
তবে আলোচনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি শান্তির পরিবর্তে আত্মসমর্পণেরই ইঙ্গিত করছে। একই মার্কিন-পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সামনের বৈঠক অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে উস্কে দেবে এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর কারণ বিবিধ। ঘোষণাপত্রে বর্ণিত শর্তগুলো লেবাননের সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ এবং ইসরায়েলি আধিপত্যের স্বীকৃতির শামিল।
লেবাননের কর্মকর্তা ও মূলধারার গণমাধ্যমের মধ্যে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের এক আলোচনার পরপরই সার্বভৌমত্বের এই আত্মসমর্পণ ঘটছে। এর লক্ষ্য হলো বিদেশি দখলদারিত্ব প্রতিরোধের পরিবর্তে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা। সরকার ইতোমধ্যে দলটির সামরিক ও নিরাপত্তা অভিযানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে ইসরায়েলকে ‘পরিকল্পিত, আসন্ন বা চলমান আক্রমণের বিরুদ্ধে যে কোনো সময় আত্মরক্ষার অধিকার’ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু লেবাননের বিষয়ে এমন কোনো উল্লেখ নেই। এ ছাড়া দুই দেশকে যুদ্ধমুক্ত বলেও ঘোষণা করা হয়েছে, যা চলমান লড়াইয়ের মধ্যে একটি অযৌক্তিক দাবি। তা ছাড়া লেবাননের সাংবিধানিক ক্ষমতা জোরপূর্বক দখলের সুযোগ রাখা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধ-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রিপরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের বিধান রয়েছে।
এই ব্যবস্থাগুলোতে লেবানন সরকারকে ইসরায়েলে হামলা চালানো থেকে হিজবুল্লাহকে বিরত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে, অথচ একইসঙ্গে ইসরায়েলের দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো উল্লেখ নেই।
সব মিলিয়ে এই শর্তগুলো ২০২৪ সালের নভেম্বরে উভয়পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে উপনীত হওয়া শর্তগুলোর চেয়েও জঘন্য। তখন ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তে সরে যাওয়ার জন্য ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল।
তেল আবিব তার সৈন্যবাহিনীকে দক্ষিণে পুনর্নিয়োগ করে এবং বেশ কয়েকটি কৌশলগত ঘাঁটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। বর্তমানে ইসরায়েল পুনরায় আক্রমণ চালিয়ে আরও ভূখণ্ড দখল করেছে।
এটি গাজার আদলে ‘একটি হলুদ রেখার’ পেছনে তথাকথিত একটি নিরাপত্তা অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা এবং তার জাতিগত নির্মূল অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রামগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু করেছে। সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং লেবাননজুড়ে সামরিক পদক্ষেপের অধিকার নিয়ে ইসরায়েল অব্যাহত সশস্ত্র প্রতিরোধকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
ইসরায়েলের ১০ হাজারেরও বেশি লঙ্ঘনের ঘটনার মুখে ১৫ মাস সংযম প্রদর্শন করে হিজবুল্লাহ গত ২ মার্চ এই সর্বশেষ পর্যায়ের লড়াই শুরু করেছে। ইসরায়েলি লঙ্ঘনের জবাব দিতে ব্যর্থ হলে এই যুদ্ধ শুরু করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠত এবং দক্ষিণকে রক্ষা করার সক্ষমতার ওপর হিজবুল্লাহর পুনরুদ্ধারকৃত সামাজিক ভিত্তি আস্থার সংকটে পড়ত।
হিজবুল্লাহর সাধারণ সম্পাদক এমনটাই বলেছেন।
শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নাইম কাসেম জোর দিয়ে বলেন, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি লঙ্ঘন কখনোই বরদাশত করবে না এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। দলটির যোদ্ধারা ইতোমধ্যে এর জবাব দিয়েছে এবং দখলদার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও করেছে।
আলোচনা নিয়ে মতবিরোধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইসরায়েলকে মোকাবিলার প্রশ্নে হিজবুল্লাহ ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদকে–সশস্ত্র প্রতিরোধ বনাম কূটনীতি–তুলে ধরে। আর ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উভয়পক্ষের দূরত্বও এতে স্পষ্ট হয়।
লেবানন দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার সঙ্গে অপরিচিত নয়, কিন্তু এই যুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। রাজনৈতিকভাবে যা সমাধান করা যায় না, শেষ পর্যন্ত তার নিষ্পত্তি হয় ময়দানে। লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
না হলে, লেবানন-ইসরায়েল যে কোনো পার্শ্বিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি হয় উপেক্ষার শিকার হবে নয় তো গৃহযুদ্ধের কারণ হবে।
দক্ষিণে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ আবার শুরু হতে যাচ্ছে। ইসরায়েলি গণহত্যামূলক কৌশল এবং উন্নত প্রযুক্তির মুখে এর ক্ষতি হবে বিশাল। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননের জনগণের নিজ ভূমির প্রতি অনুরাগ এবং ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের কয়েক দশকব্যাপী সংগ্রামের উত্তরাধিকারই এই নিশ্চয়তা দেয় যে এই ধরনের কোনো মূল্যই তাদের পূর্ণমুক্তির সংগ্রাম থেকে বিরত করতে পারবে না।
হিশাম সাফিদ্দিন: ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের কানাডা রিসার্চ চেয়ার এবং ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক; মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম।





