শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এর ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে পণ্য ও মানুষের স্রোত, মসলিন-রেশমের বেল, মধ্য এশিয়ার ঘোড়া, শুকনো ফলের কাফেলা, তীর্থযাত্রী, সুফি দরবেশ, পণ্ডিত ও শিল্পীর পদচারণা। বঙ্গ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এটি ছিল সেই সভ্যতার রক্তপ্রবাহ। এ মহাপথের ওপর ভর করেই উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক যোগাযোগের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রবাহ।
এ পথ দেখেছে সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন—চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রশাসনিক বিস্তার, শেরশাহ সুরির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মোগলদের সাম্রাজ্যিক সংহতি এবং ঔপনিবেশিক শক্তির প্রকৌশলগত পুনর্গঠন।
এ পথের অন্যতম প্রান্ত বা টার্মিনাল ছিল বাংলার প্রাচীন রাজধানী ও বাণিজ্য কেন্দ্র সোনারগাঁ। ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের যে সড়কটি আজও ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নামে পরিচিত, তা এককালীন এ মহাপথেরই অংশ বলে ধারণা করা হয়। সোনারগাঁ থেকে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা পেরিয়ে পাঞ্জাব হয়ে এ পথ গড়িয়ে যেত পশ্চিমের দিকে—কাবুলের দোরগোড়ায়, পর্বতপথের ছায়ায়।
মৌর্য যুগে এ পথ পরিচিত ছিল ‘উত্তরাপথ’ নামে; মধ্যযুগে ‘সড়ক-ই-আজম’ বা ‘শাহ রাহ-ই-আজম’; মোগল আমলে ‘বাদশাহী সড়ক’; আর ঔপনিবেশিক যুগে ‘লং ওয়াক’ নামে ডাকতে ডাকতেই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী নাম হয়ে যায় ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রথ থেকে শেরশাহ সুরির অশ্বারোহী বাহিনী, মোগল শাহজাদার শৌখিন কাফেলা থেকে ব্রিটিশ গোলন্দাজ দল—শাসক বদলেছে বারবার, কিন্তু প্রত্যেকেই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডকে আপন করে নিয়েছেন, সংস্কার করেছেন, নিজের ক্ষমতার মেরুদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পশ্চিমের পর্বতপথ থেকে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা হয়ে বাংলার উর্বর ভূখণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এ দীর্ঘ পথ কার্যত উপমহাদেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন আধুনিক রেলপথের যাত্রা শুরু হলো, তখনই দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের মানচিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে। যে পণ্য আগে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পথ চলত গরুর গাড়ির চাকায়, উটের পায়ে, কাফেলার হাঁকডাকে; যে যাত্রা শিখত সরাইখানার উঠোনে বিশ্রামের নিয়ম, কূপের জল, ছায়াগাছের দয়া—রেলগাড়ি এসে সেই সব কিছুকে হঠাৎ ‘ধীর’ আর ‘পুরনো’ করে দিল। প্রাচীন মহাসড়কটি হারাতে থাকল তার চিরচেনা প্রাণস্পন্দন। এরপর ১৯৪৭-এর দেশভাগ এ পথের ইতিহাসে এক নির্মম ছেদ টানে।
যে করিডোর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ ও পণ্যের চলাচলকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল, একদিন তা কাঁটাতারে কেটে ফেলা হলো। এরপর নতুন নতুন রাষ্ট্র নিজেদের মানচিত্র আঁকল, সড়ক বানাল, নতুন করিডোর দাঁড় করাল। কিন্তু যে পুরনো পথকে ঘিরে এ ভূখণ্ডের হাজার বছরের সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সংস্কৃতির বিনিময় গড়ে উঠেছিল সে পথ অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়ল। সে জৌলুশময় পথের ঠিকানা হলো কেবল ধুলো জমা ইতিহাসের ধূসর পাতায়।
প্রায় চার হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার এবং পরবর্তী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে হরপ্পা থেকে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে মানুষের চলাচল ও বিনিময়ের একটি ধারাবাহিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, যার কেন্দ্রে ছিল বাণিজ্য। পণ্য থেকে মানুষ, ধর্ম-দর্শন থেকে সংস্কৃতি সবই চলাচল করত নির্দিষ্ট কিছু স্থলপথ ধরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পথগুলোই পরিণত হয় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থার ভিত্তিতে।
১৯২০-এর দশকে জন মার্শাল, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও দয়ারাম সাহনির নেতৃত্বে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে উঠে আসে, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর মতো নগর কেন্দ্রগুলো মূলত বাণিজ্যনির্ভর ছিল; ফলে বিভিন্ন বসতি ও বাজারের মধ্যে যোগাযোগের জন্য স্থলপথের প্রয়োজন ছিল। সিন্ধু সভ্যতার পতনের পরবর্তী সময়ে যে সাংস্কৃতিক বিস্তার হরপ্পা অঞ্চল থেকে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা তাকে ‘সেমেট্রি এইচ কালচার’ নামে চিহ্নিত করেছেন।
এ সংস্কৃতির সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ থেকে ১৩০০ সালের মধ্যে। এর প্রধান নিদর্শন প্রথম আবিষ্কৃত হয় পাকিস্তানের হরপ্পা নগরের ‘সেমেট্রি এইচ’ নামে পরিচিত সমাধিস্থলে। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে পাঞ্জাব অঞ্চল থেকে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকা পর্যন্ত এ বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার ফল ছিল না; বরং মানুষের চলাচল, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং নতুন বসতি স্থাপনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তা যুক্ত ছিল। (Jonathan Mark Kenoyer—Ancient Cities of the Indus Valley Civilization, Oxford University Press, 1998)
এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ‘সেমেট্রি এইচ কালচার’ ও পরবর্তী উত্তরাপথ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারণার মধ্যে একটি দূরবর্তী সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তখন অবশ্য ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নামে কিছু ছিল না। কিন্তু উত্তর ভারতের সমতলভূমিজুড়ে পশ্চিম থেকে পূর্বে মানুষের চলাচলের যে প্রাচীন পথগুলো ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী যোগাযোগ পথে রূপ নিতে শুরু করে। হরপ্পা অঞ্চল থেকে গঙ্গা অববাহিকার দিকে সাংস্কৃতিক বিস্তার সেই চলাচলের ধারারই প্রতিফলন। এ ধারাবাহিক পথই পরবর্তী যুগে মৌর্যদের ‘উত্তরাপথ’ নামে পরিচিত মহাসড়কের ভিত্তি তৈরি করে।
মৌর্য সাম্রাজ্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২-১৮৫) উত্থানের সময় এ প্রাচীন পথ একটি সুসংগঠিত রূপ পায়। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে পাটলিপুত্র (তৎকালীন মগধ রাজ্যের রাজধানী এবং বর্তমান বিহারের পাটনা শহরের প্রাচীন রূপ) থেকে তক্ষশীলা (বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থান) পর্যন্ত যে মহাসড়ক নির্মিত হয়, তা কেবল প্রশাসনিক যোগাযোগের জন্যই নয়, জ্ঞান ও বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তক্ষশীলা তখন ছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র, আর সেই পথ ধরে মধ্য এশিয়ার বালখ পর্যন্ত যাতায়াত সম্ভব ছিল। খাইবার পাস অতিক্রম করে গঙ্গা-সিন্ধু সমভূমির দিকে ঢুকতে চাইলে এ পথই ছিল প্রধান ভরসা। গ্রিক পর্যবেক্ষকদের বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে মৌর্য শাসকরা এ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল শ্রমশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। প্রাচীন গ্রন্থে এ পথের নাম পাওয়া যায় ‘উত্তরাপথ’—অর্থাৎ উত্তরমুখী মহাসড়ক।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় পাঁচশ সালের দিকে প্রাচীন ভারতের ব্যাকরণবিদ ও ভাষাতাত্ত্বিক পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থে প্রথম ‘উত্তরাপথ’ শব্দের পরিচিত উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার অশোকের স্তম্ভলিপিতে এমন এক রাজপথের কথা বলা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর বিশ্রামাগার ও কূপের ধারাবাহিক ব্যবস্থা ছিল
। মৌর্য রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশীলা পর্যন্ত পথটিকে যা যুক্ত করত। আরো প্রাগৈতিহাসিক মৃৎপাত্র ও বস্তুসংস্কৃতির নিদর্শন ইঙ্গিত দেয়, এ উত্তরাঞ্চলীয় মহারুট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি; সময়ের স্তরে স্তরে মানুষের চলাচল, বাণিজ্য আর বসতির চাপে ধীরে ধীরে সে পথই বড় হয়ে উঠেছে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, এ দীর্ঘ করিডোরের নানা স্থানে পাওয়া যায় অশোকস্তম্ভ, শিলালিপি, আর বৌদ্ধ প্রত্ননিদর্শন থেকে প্রমাণ মেলে এটি আধুনিককালের আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তক্ষশীলা হয়ে এটি খাইবার পাস অতিক্রম করে মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে পারস্য, বাখত্রিয়া ও মধ্য এশিয়ার বণিকরা এ পথ ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করত। এখানকার পণ্য বহন করে নিয়ে যেত পশ্চিমে। একই সঙ্গে পথটি গঙ্গা উপত্যকা হয়ে ধীরে ধীরে পূর্বদিকে বিস্তৃত হয়, যার শেষ প্রান্ত গিয়ে পৌঁছায় বঙ্গ অঞ্চলের উর্বর ভূখণ্ড ও নদীবন্দরগুলোর দিকে। এভাবেই উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বাংলার কৃষি ও বাণিজ্য অর্থনীতির একটি প্রাথমিক সংযোগ তৈরি হয়।
আলেকজান্ডারের অভিযানের পর ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থানকারী গ্রিক দূত মেগাস্থেনিস তার গ্রন্থ ‘ইনডিকা’তে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তিনি ছিলেন গ্রিক দূত, যাকে মেসিডোনিয়ান জেনারেল সেলিউকাস নিকেতর পাঠিয়েছিলেন মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের দরবারে। যদিও তার মূল রচনার অনেকাংশ হারিয়ে গেছে, পরবর্তী গ্রিক লেখক স্ট্রাবো ও এরিয়ান তাদের লেখায় মেগাস্থেনিসের বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন।
সেখানে পাটলিপুত্র থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘ সড়কের কথা উল্লেখ রয়েছে, যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এ যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝা যায় মৌর্য প্রশাসনের কাঠামো থেকেও। একটি বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য দ্রুত বার্তা আদান-প্রদান, সৈন্য চলাচল এবং কর সংগ্রহ নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। তাই এ পথ ধরে নিয়মিত ভ্রমণ করত বণিক কাফেলা, প্রশাসনিক দূত ও সেনাবাহিনী। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের মতে, মৌর্য শাসকরা বাণিজ্যপথ ও সড়ক যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, কারণ এগুলো সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সংহতি বজায় রাখতে সহায়ক ছিল।
তবে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক বিস্তার বঙ্গ অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছলেও পূর্বদিকে একটি দীর্ঘ ও সুসংগঠিত মহাসড়কের পূর্ণ রূপ তখনো গড়ে ওঠেনি। গঙ্গা উপত্যকা ধরে নদীপথ ও আঞ্চলিক স্থলপথের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় থাকলেও পরে যে সড়ক ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নামে পরিচিত হয়, তার বিস্তৃত অবকাঠামোগত রূপ তখনো সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি।
মৌর্য যুগে উত্তর ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা যে যথেষ্ট সংগঠিত ছিল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় ভূগোলবিদ স্ট্রাবোর বর্ণনা থেকে। ‘জিওগ্রাফিকা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, পাটলিপুত্র (পালিবোথ্রা) নগরী থেকে উত্তর-পশ্চিমের দিকে একটি দীর্ঘ রাজপথ বিস্তৃত ছিল এবং সেই পথের দূরত্ব মাপা ও চিহ্নিত করার ব্যবস্থাও ছিল। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে এ মহাসড়কগুলো যত্নসহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর চিহ্ন বসানো থাকত, যাতে যাত্রীরা পথের দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
গ্রিক ঐতিহাসিক এরিয়ানও তার ইন্ডিকা গ্রন্থে ভারতের রাজপথ সম্পর্কে লিখেছেন যে এসব সড়কের পাশে কর্মকর্তারা নিয়োজিত থাকতেন, যারা চলাচল ও বিভিন্ন ঘটনার তথ্য শাসকদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এ বিবরণগুলো থেকে বোঝা যায় যে মৌর্য যুগের রাজপথ শুধু বাণিজ্যিক যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না; বরং তা ছিল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, সংবাদ আদান-প্রদান ও সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ইতিহাসবিদদের মতে, পাটলিপুত্র থেকে উত্তর-পশ্চিমের তক্ষশীলা পর্যন্ত বিস্তৃত এ প্রাচীন রাজপথই পরবর্তী যুগে বিকশিত হয়ে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে।
মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তার চন্দ্রগুপ্তের সময় শুরু হলেও সম্রাট অশোকের শাসনামলে এ যোগাযোগ ব্যবস্থা নতুন মাত্রা লাভ করে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তার শাসনামলে সাম্রাজ্যের প্রধান সড়কপথগুলো শুধু প্রশাসনিক ও সামরিক চলাচলের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জনসাধারণের যাত্রা ও বাণিজ্যের জন্যও আরো সুবিধাজনক করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। অশোক রাজপথের ধারে বৃক্ষরোপণ, কূপ খনন এবং যাত্রীদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এমনকি মানুষের পাশাপাশি পশুর জন্যও ছায়া ও পানির ব্যবস্থা করতে রাস্তার পাশে বট ও আমগাছ লাগানো হয়েছিল। নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর কূপ খনন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে অশোক তার ধর্মনীতি বা ‘ধর্ম’ প্রচারের উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শিলালিপি ও স্তম্ভ স্থাপন করেন, যেগুলোর অনেকই গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের কাছে স্থাপন করা হয়েছিল যাতে পথিকরা সেগুলো দেখতে পারে।
এর ফলে রাজপথ শুধু যোগাযোগের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সাম্রাজ্যের নৈতিক বার্তা প্রচারেরও এক কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে। অশোকের এ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ সড়ক ব্যবস্থাকে আরো সুসংগঠিত করে এবং উত্তর ভারতের দীর্ঘ স্থলপথ নেটওয়ার্ককে দীর্ঘকাল সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পরও উত্তর ভারতের প্রাচীন রাজপথ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।
বরং গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩১৯-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) সময় গঙ্গা উপত্যকার অর্থনীতি ও নগরজীবনের পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে সঙ্গে এ পথ আবারো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত ও পরবর্তীকালে চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয়ের শাসনামলে গঙ্গা অববাহিকার বহু নগর, বিশেষ করে পাটলিপুত্র, মথুরা ও কৌশাম্বী—আবার সক্রিয় বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এসব নগরের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতে যে স্থলপথ ব্যবহৃত হতো, ইতিহাসবিদদের মতে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রাচীন উত্তরাপথের ধারাবাহিকতা।গুপ্ত যুগে এ পথের বড় ধরনের অবকাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না; তবে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রা যে সক্রিয় ছিল, তার ইঙ্গিত বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।
পঞ্চম শতকে চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন যখন ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন, তখন তিনি গঙ্গা উপত্যকার বিভিন্ন নগরের মধ্যে দীর্ঘ স্থলযাত্রার বর্ণনা দেন। তার বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে উত্তর ভারতের শহরগুলো একে অপরের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত ছিল এবং তীর্থযাত্রী, বণিক ও ভ্রমণকারীরা নিয়মিত সেই পথ ব্যবহার করত।সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবৃত্তান্তে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থলপথ ও নগরসংযোগের বিস্ময়কর চিত্র উঠে আসে।
তিনি তার যাত্রাপথে শহর থেকে শহরের দূরত্ব নির্দিষ্টভাবে ‘লি’ এককে উল্লেখ করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় যে তখনকার ভারতে দীর্ঘ দূরত্বের স্থলযাত্রা একটি পরিচিত ও সংগঠিত প্রক্রিয়া ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে ভল্লভী থেকে প্রায় এক হাজার লি (প্রতি লি আনুমানিক আধা কিলোমিটার) উত্তরে গিয়ে আবার অন্য রাজ্যে পৌঁছতে হয়, আবার কোথাও দুই হাজার লি পথ অতিক্রম করে মালব অঞ্চলে পৌঁছানোর কথা বলেছেন।
এসব বর্ণনা প্রমাণ করে যে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে সংযোগকারী স্থলপথগুলো কেবল ব্যবহৃতই হতো না, বরং ভ্রমণকারীরা দূরত্বের হিসাবও স্পষ্টভাবে জানতেন।
হিউয়েন সাঙের বিবরণে এমনও দেখা যায় যে কোনো কোনো শহর ছিল বড় বাণিজ্য কেন্দ্র। তিনি সুরাষ্ট্র অঞ্চলের একটি নগরকে ‘বাণিজ্যের এক বৃহৎ এম্পোরিয়াম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ তথ্য থেকে বোঝা যায় যে পথের পাশে থাকা নগরগুলো শুধু ধর্মীয় তীর্থ বা প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না; এগুলো ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পণ্য, মানুষ ও ধারণার চলাচল এ পথগুলোর মাধ্যমেই সম্ভব হতো।
আবার তার যাত্রাপথে বারাণসীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরেরও বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেন যে গঙ্গার তীরে বিস্তৃত এ শহর ছিল জনবহুল এবং সেখানে বহু মঠ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল। শহরের বিস্তৃতি, ধর্মীয় কেন্দ্রের সংখ্যা এবং মানুষের সমাবেশ থেকে বোঝা যায় যে গঙ্গা উপত্যকার এ নগরগুলো একে অপরের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত ছিল এবং সেই যোগাযোগই নগরসভ্যতার বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
দিল্লি সালতানাত (১২০৬-১৫২৬ খ্রি.) প্রতিষ্ঠার পর এ পুরনো পথ নতুন প্রশাসনিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ত্রয়োদশ শতকে দিল্লিকে কেন্দ্র করে যে তুর্কি-আফগান শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তার জন্য সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে সংযুক্ত রাখার একটি স্থলপথের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন পূরণে গঙ্গা উপত্যকা ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের মধ্যে প্রচলিত প্রাচীন পথগুলোই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইতিহাসবিদদের মতে, দিল্লি থেকে লাহোর, পাঞ্জাব এবং পূর্বদিকে গঙ্গা অববাহিকার দিকে যাতায়াতের জন্য যে পথ ব্যবহৃত হতো, সেটিই মূলত সেই পুরনো উত্তরাপথের ধারাবাহিকতা বহন করছিল।
দিল্লি সালতানাতের প্রশাসনিক কাঠামো এ পথকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সাম্রাজ্যের কর আদায়, সামরিক বাহিনীর দ্রুত চলাচল এবং প্রাদেশিক গভর্নরদের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য স্থলপথ ছিল প্রধান মাধ্যম। সুলতানদের সেনাবাহিনী প্রায়ই দিল্লি থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত কিংবা গঙ্গা উপত্যকার দিকে অভিযান চালাত, আর সেই অভিযানের জন্য ব্যবহার করা হতো এ দীর্ঘ যোগাযোগপথ। ফলে পথের ধারে বাজার, সরাইখানা ও ছোট ছোট জনবসতিও ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে।
এই সময়ের ভ্রমণকারীদের বর্ণনাতেও উত্তর ভারতের এ পথগুলোর গুরুত্বের আভাস পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা তার রিহলা গ্রন্থে সড়ক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন যে দীর্ঘ পথের ধারে ভ্রমণকারীদের থাকার জন্য সরাইখানা এবং নিরাপত্তার জন্য পাহারার ব্যবস্থা ছিল। তিনি নিজেও বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন এবং পথে পথে বাণিজ্যিক কাফেলার সঙ্গে চলেছেন।
তার বর্ণনায় স্পষ্ট বোঝা যায় যে এ পথগুলো কেবল সামরিক বা প্রশাসনিক যোগাযোগের জন্য নয়, বরং বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। এ কাফেলাভিত্তিক ভ্রমণই মধ্যযুগের এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ বাণিজ্যপথগুলোর প্রাণ ছিল। (The Travels Of Ibn Batuta, Translated By Rev. Samuel Le)
এ বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে দিল্লি সালতানাত যুগে উত্তর ভারতের প্রধান সড়কগুলো কার্যত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে পরিণত হয়েছিল। মধ্য এশিয়া, পারস্য ও আরববিশ্বের ব্যবসায়ীরা এ পথ ধরে ভারতে আসতেন এবং এখানকার বস্ত্র, মসলা ও অন্যান্য পণ্য বহন করে নিয়ে যেতেন। ফলে এ সড়কপথগুলো অর্থনীতির রক্তনালির মতো কাজ করত—যেখানে মানুষের চলাচলের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য, ধারণা ও সংস্কৃতিও প্রবাহিত হতো।
দিল্লি সালতানাত যুগে উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরের মধ্যে যোগাযোগের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল, কিন্তু এগুলো
ছিল বিচ্ছিন্ন ও অনিয়মিত। ষোড়শ শতকে এসে এ বিচ্ছিন্ন পথগুলোকে এক বিশাল সাম্রাজ্যিক সড়কে রূপ দেয়ার কাজ শুরু করেন আফগান শাসক শেরশাহ সুরি। ইতিহাসে তার শাসনকাল ছিল মাত্র পাঁচ বছর—১৫৪০ থেকে ১৫৪৫। কিন্তু এ অল্প সময়েই তিনি যে প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার করেছিলেন, তা এ অঞ্চলের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।
তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ছিল যোগাযোগ পথকে পুনর্গঠন করে একটি দীর্ঘ সাম্রাজ্যিক মহাসড়ক তৈরি করা। শেরশাহ সুরি যে সড়কটি পুনর্গঠন করেছিলেন, সেটি ইতিহাসে ‘সড়ক-ই-আজম’ নামে পরিচিত ছিল। পরে ব্রিটিশ যুগে এটিই ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নামে পরিচিত হয়।
শেরশাহ সুরি প্রাচীন উত্তরাপথ এবং মধ্যযুগীয় বাণিজ্যপথগুলোর ওপর ভিত্তি করে একটি দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করেন। এ সড়ক পশ্চিমে আফগান সীমান্তের অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা অতিক্রম করে পূর্বে বাংলার সমৃদ্ধ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।
১৯২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এ মহাসড়ক প্রায় দেড় হাজার মাইল দীর্ঘ ছিল এবং আফগান সীমান্ত থেকে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা হয়ে বাংলার সমৃদ্ধ অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। (Roger W. Parkhurst, India and the Grand Trunk Road, The Military Engineer, 1925)
শেরশাহের উদ্যোগে এ সড়ক কেবল মেরামতই হয়নি; বরং এটি একটি পরিকল্পিত সাম্রাজ্যিক অবকাঠামোয় পরিণত হয়। রাস্তার দুই পাশে নিয়মিত দূরত্বে সরাইখানা নির্মাণ করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রতি দুই কস বা কয়েক মাইল পরপর এসব সরাইখানা স্থাপন করা হয়েছিল। এগুলো ছিল মূলত কারাভানসরাই—যেখানে দূরদূরান্ত থেকে আসা বণিক, যাত্রী ও সরকারি দূতরা বিশ্রাম নিতে পারতেন।
সরাইখানাগুলোতে পানির কূপ, বিশ্রামের জায়গা এবং পশু রাখার ব্যবস্থাও ছিল। অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমান ভ্রমণকারীদের জন্য আলাদা রান্নার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। ফলে এ পথ শুধু চলাচলের রাস্তা ছিল না; এটি ছিল একটি চলমান সামাজিক অবকাঠামো।
এ সড়কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ডাক ব্যবস্থা। শেরশাহ সরাইখানাগুলোকে ডাকঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করেন। প্রতিটি সরাইখানায় ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহক প্রস্তুত থাকত, যারা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে সরকারি বার্তা পৌঁছে দিতেন। এর ফলে রাজধানী ও দূরবর্তী প্রদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ অনেক দ্রুত হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয় এবং সীমান্ত অঞ্চলের খবর দ্রুত কেন্দ্রে পৌঁছতে শুরু করে। সাম্রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেরশাহের আমলে সড়কের দুই পাশে অসংখ্য গাছও লাগানো হয়। যেগুলো একদিকে যেমন যাত্রীদের জন্য ছায়া তৈরি করত, অন্যদিকে রাস্তার দিকনির্দেশও নির্ধারণ করত। একই সঙ্গে নিয়মিত দূরত্বে মাইলফলক বা পথচিহ্ন স্থাপন করা হয়েছিল। এতে ভ্রমণকারীরা সহজে দূরত্ব নির্ণয় করতে পারতেন। এ ধরনের পরিকল্পিত অবকাঠামো মধ্যযুগীয় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে খুবই বিরল ছিল।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এ সড়ক ছিল বিপ্লবাত্মক। শেরশাহ সুরির নির্মিত পথটি মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও উত্তর ভারতের বাজারকে বাংলার সমৃদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করে। পশ্চিম থেকে ঘোড়া, ধাতু ও বিলাসপণ্য আসত; আর পূর্ব থেকে মসলিন, রেশম, চাল ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য পশ্চিমে যেত। আফগানিস্তান, সমরকন্দ ও বুখারার ব্যবসায়ীরা বিশাল কাফেলা নিয়ে এ পথ ধরে ভারতে আসতেন। এ বাণিজ্যিক কার্যকলাপের ফলে যাত্রাপথের পাশে বহু শহর ও বাজার গড়ে ওঠে। দিল্লি, আগ্রা, কানৌজ, এলাহাবাদ, বারাণসী, পাটনা এবং বাংলার বিভিন্ন শহর এ পথের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে এ সড়ক কার্যত উত্তর ভারতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে পরিণত হয়।
শেরশাহের সময়ে সিন্ধু নদী পার হয়ে সড়কটি পাঞ্জাবের সমতলভূমি অতিক্রম করত। এ অংশে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডি অঞ্চল। পাঞ্জাব তখন উত্তর ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। মধ্য এশিয়া থেকে আসা কাফেলাগুলো এখান দিয়ে দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে প্রবেশ করত। পাঞ্জাব থেকে পথটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এসে দিল্লিতে পৌঁছত। দিল্লি তখন উত্তর ভারতের প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে সড়কটি আগ্রা, মথুরা ও কানৌজের দিকে এগিয়ে যেত।
এ অঞ্চলগুলো গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের কেন্দ্র, যা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দিল্লি অঞ্চল অতিক্রম করার পর পথটি গঙ্গা উপত্যকার দিকে এগিয়ে যেত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল এলাহাবাদ (বর্তমান প্রয়াগরাজ) ও বারাণসী। এ অঞ্চল ছিল ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। গঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকার কারণে এখানকার বাজারগুলো উত্তর ভারতের বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। (Romila Thapar, History of Early India: From the Origins to AD 1300)
এরপর সড়কটি পাটনা অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যেত, যা প্রাচীন পাটলিপুত্র নগরীর উত্তরাধিকার বহন করছিল। ইতিহাসে পাটনা দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। শেরশাহ সুরির নিজের জন্মভূমিও ছিল বিহারের সাসারাম অঞ্চল। ফলে তিনি এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
শেষ পর্যন্ত সড়কটি বাংলার দিকে প্রবেশ করত এবং বাংলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করত। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এ পথ পূর্বদিকে সোনারগাঁ ও বাংলার সমৃদ্ধ বন্দরনগরীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাংলার পূর্বাঞ্চলের বন্দরগুলোর সঙ্গে তখন যোগাযোগ হতো নদীপথে। গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্র হয়ে পণ্য সোনারগাঁ বা গৌড়ে এসে পৌঁছত, তারপর সেখান থেকে স্থলপথে পশ্চিমে যেত। এ পুরো সড়কটি পশ্চিমে আফগান সীমান্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে পাঞ্জাব, দিল্লি, গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা, বিহার হয়ে বাংলার পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ মাইল বা প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।
শেরশাহের মৃত্যুর পরও এ পথের ইতিহাস থেমে যায়নি। মোগলরা ক্ষমতায় ফিরে এসে তার নির্মিত সড়ক ব্যবস্থাকেই নিজেদের সাম্রাজ্যিক অবকাঠামোর অংশে পরিণত করে। আকবরের আমলে এ রাস্তা শুধু মেরামতই করা হয়নি, বরং তা প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। আকবর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সুবা ও রাজধানীর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ বজায় রাখতে ডাক ব্যবস্থা ও সরাইখানার নেটওয়ার্ককে আরো সুসংগঠিত করেন। ফলে আগ্রা, দিল্লি, লাহোর, এলাহাবাদ, পাটনা ও বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়।
এ সময় বাংলার সঙ্গে উত্তর ভারতের যোগাযোগও আরো সুদৃঢ় হয়। শেরশাহ যে সড়কটি সোনারগাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত
করেছিলেন, মোগলরা সেটিকে গঙ্গা অববাহিকার প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বাংলার রাজধানী যখন গৌড় থেকে ধীরে ধীরে ঢাকা অঞ্চলে সরে আসে, তখন উত্তর ভারতের বাণিজ্যিক পথগুলোর সঙ্গে বাংলার অভ্যন্তরীণ নদীপথ মিলিত হয়ে এক বৃহৎ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে। উত্তর ভারত থেকে আসা ব্যবসায়ী কাফেলা এ সড়ক ধরে বাংলায় পৌঁছত, আর বাংলার পণ্য—বিশেষ করে রেশম, তুলা, মসলিন ও চাল—এ পথ ধরে পশ্চিম ভারতে ছড়িয়ে পড়ত।
মোগল যুগে এ সড়কের গুরুত্ব আরো বাড়ে। কারণ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। দিল্লি ও আগ্রা থেকে বাংলার দিকে যে প্রশাসনিক যোগাযোগ ছিল, তা এ মহাসড়কের মাধ্যমেই বজায় থাকত। মোগল কর্মকর্তারা রাজস্ব সংগ্রহ, সৈন্য পরিবহন এবং প্রাদেশিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য নিয়মিত এ পথ ব্যবহার করতেন। ফলে এ স্থলপথ তখন কেবল একটি বাণিজ্যপথ নয়, বরং সমগ্র মোগল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক মেরুদণ্ডে পরিণত হয়।
সপ্তদশ শতকে মোগল গভর্নর শায়েস্তা খানের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের দখল (১৬৬৬) নেয়ার পর বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরো শক্তিশালী হয়। উত্তর ভারতের স্থলপথে আসা পণ্য তখন বাংলার নদীপথ হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছতে শুরু করে। এখান থেকে সেই পণ্য সমুদ্রপথে আরাকান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আরব বাণিজ্য জগতের দিকে ছড়িয়ে পড়ত। ফলে শেরশাহ সুরির তৈরি মহাসড়ক এবং মোগলদের সম্প্রসারিত প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক একসঙ্গে মিলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক করিডোরে রূপ নেয়।
মোগলরা প্রাচীন এ পথকে একটি সুসংগঠিত মহাসড়ক ব্যবস্থায় রূপ দেয়। তারা প্রতি ১০-১৫ কিলোমিটার পরপর সরাইখানা নির্মাণ করে, যেখানে যাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা, খাবার এবং নিরাপত্তা মিলত। তীব্র গ্রীষ্মের রোদ থেকে রক্ষা করতে রাস্তার দুই পাশে, বিশেষ করে আম ও বটগাছ লাগানো হয়। দূরত্ব নির্দেশ ও পথ চিনতে সাহায্যের জন্য স্থাপন করা হয় স্বতন্ত্র কোস মিনার, যা যাত্রীদের দিকনির্দেশনা দিত এবং রাজকর্মচারীদের জন্যও একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করত।
পাশাপাশি রাস্তার পৃষ্ঠ উন্নত করা হয়, নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ চলত, আর বড় নদীগুলোর ওপর প্রয়োজনীয় সেতু নির্মাণ করা হয়। মোগল শাসনামলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড কার্যত সাম্রাজ্যের প্রাণরেখায় পরিণত হয়। এ সড়ক বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে আগ্রা ও দিল্লির মতো সাম্রাজ্যিক রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করত; সেখান থেকে তা লাহোর হয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের কৌশলগত অঞ্চলের দিকে প্রসারিত ছিল। ফলে সেনাবাহিনীর দ্রুত চলাচল সম্ভব হয়, রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক তদারকি কার্যকর হয়, বাণিজ্য বিস্তৃত হয় এবং বিশাল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সংহতি টিকিয়ে রাখা সহজ হয়। (Parkhurst, India and the Grand Trunk Road, 1925)
ব্রিটিশদের শাসনামলে এ ঐতিহাসিক পথের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে তখন তারা পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত এ পথের গুরুত্ব বুঝতে পারে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় সড়কটির কৌশলগত গুরুত্ব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে; বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ বাহিনীর দ্রুত সৈন্য চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে কোম্পানি সরকার রাস্তার বড় ধরনের পুনর্গঠন শুরু করে। তখন সড়কটি কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে লাহোর পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের প্রধান স্থলপথে পরিণত হয়। এ পুনর্গঠনের সময়ই ব্রিটিশ প্রশাসন পুরো দীর্ঘ রুটটিকে একটি একক নাম দেয় ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’। এ নাম দ্রুত সরকারি মানচিত্র, প্রশাসনিক নথি ও সামরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে ঐতিহাসিক পথটির স্থায়ী নাম হয়ে যায়। হাজার বছরের উত্তরাধিকার বহন করা পথটির নাম হয়ে যায় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে। (B. R. Nanda, Road Transport in India: A Historical Survey, Government of India, 1960.)
এ দীর্ঘ পথের ইতিহাস শুধু সাম্রাজ্য বা বাণিজ্যের গল্প নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শতাব্দীব্যাপী এক প্রকৌশল বিবর্তনের ইতিহাসও। প্রাচীন ভারতের উত্তরাপথ সম্পর্কে ইতিহাসবিদ উপিন্দর সিং তার গ্রন্থ ‘আ হিস্টোরি অব এনশিয়েন্ট অ্যান্ড আর্লি মেডিভাল ইন্ডিয়া’-তে উল্লেখ করেছেন যে মৌর্য যুগে প্রধান সড়কগুলো আধুনিক অর্থে পাকা ছিল না; এগুলো সাধারণত শক্ত করে চাপানো মাটির রাস্তা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বা জনবহুল অঞ্চলে বর্ষায় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কমাতে এবং যাতায়াত সহজ রাখতে কোথাও কোথাও কাঁকর বা ছোট পাথর ব্যবহার করা হতো।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় এ সড়কগুলো বন্যা বা ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলায় স্থানীয় জ্ঞান ও সাধারণ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। মৌর্য যুগে চন্দ্রগুপ্ত ও অশোকের আমলে রাস্তার মূল ভিত্তি তৈরি করা হতো শক্ত করে চাপা মাটি বা ‘র্যামড আর্থ’ দিয়ে, যার ওপর কাঁকর ও ছোট পাথর ছড়িয়ে চওড়া একটি টেকসই অবয়ব দেয়া হতো। বর্ষাকালে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকার বন্যার জল থেকে সুরক্ষা পেতে রাস্তাটিকে সমতল ভূমি থেকে উঁচুতে এমব্যাঙ্কমেন্ট বা বাঁধের মতো করে তৈরি করা হতো।
এ কারিগরি নকশায় রাস্তাটিকে মাঝখানে কিছুটা উঁচু ও দুপাশে ঢালু রাখা হতো যাতে বৃষ্টির জল মাঝপথে জমে না থেকে দুপাশের নালায় গড়িয়ে যেতে পারে। রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে লাগানো বট ও আমগাছ কেবল পথিককে ছায়া দিত না, বরং এদের শিকড় মাটির ক্ষয় রোধ করে সড়কের স্থায়িত্ব বাড়াত। তবে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তৎকালীন ‘বিষ্টি’ বা কর্ভি লেবার প্রথার মাধ্যমে স্থানীয় শ্রমিকদের ব্যবহার করে বর্ষা শেষে পুনরায় চাপা মাটি ও কাঁকর ছড়িয়ে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করা হতো।
ষোড়শ শতকে শেরশাহ সুরির আমলে এ প্রাচীন পথ প্রথমবারের মতো পরিকল্পিত সাম্রাজ্যিক সড়কে রূপ নিতে শুরু করে। তখন রাস্তার মূল কাঠামো ছিল শক্ত করা মাটি, যার ওপর কাঁকর, ছোট পাথর বা ইটের খোয়া ছড়িয়ে পথকে আরো টেকসই করা হতো। একই সঙ্গে রাস্তার ধারে গাছ লাগানো, নির্দিষ্ট দূরত্বে কূপ খনন এবং সরাইখানা নির্মাণের মতো অবকাঠামোও গড়ে তোলা হয়।
প্রতি দুই কোস অন্তর নির্মিত সরাইখানাগুলো তখন কেবল বিশ্রামাগার নয়, বরং এক একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। সেখানে নিয়োজিত কর্মীরা ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাস্তার কোথাও ধস নামলে সেই খবর দ্রুত পৌঁছে দিতেন।
পরবর্তী সময়ে মোগল যুগে, বিশেষ করে আকবরের আমলে, এ সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে। মোগলরা রাস্তার কাঠামো পুরোপুরি বদলে দেয়নি; বরং শেরশাহের নির্মিত পথকে মেরামত করে ব্যবহার করেছে।
মোগলরা রাস্তার উপরিভাগ বা সারফেস তৈরির জন্য প্রধানত ‘কাঁকর’ ব্যবহার করত। এটি ছিল এক ধরনের চুনাপাথর মিশ্রিত শক্ত মাটির দলা বা নুড়ি। এ কাঁকরগুলো বিছিয়ে তার ওপর জল ছিটিয়ে ভারী পাথরের রোলার দিয়ে পিটিয়ে অত্যন্ত শক্ত একটি স্তর তৈরি করা হতো। অনেক জায়গায় ইটের গুঁড়া এবং চুন-সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করা হতো যা বৃষ্টির জলকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিত। গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা শহরের ভেতরের অংশগুলোতে চ্যাপ্টা পাথর বা ইটের পেভমেন্ট তৈরি করা হতো।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ পথ দিয়ে নানা ধরনের পণ্য পরিবাহিত হয়েছে, যার ফলে আফগানিস্তান থেকে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের অর্থনীতি ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পূর্বাঞ্চল থেকে আসত বাংলার বিখ্যাত বস্ত্র—বিশেষ করে মসলিন ও রেশম, যেগুলো সারা এশিয়ায় খ্যাতি অর্জন করেছিল। উর্বর বাংলায় উৎপাদিত চালও বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছত এ পথ ধরে।
একই সঙ্গে নীলচাষ বিস্তারের ফলে নীল গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্যে পরিণত হয়। পরে আফিমও বাংলার একটি প্রধান বাণিজ্যপণ্য হয়ে পশ্চিমে পাঠানো হতো। বাংলায় উৎপাদিত সাল্টপিটার বা দাহ্য লবণ, যা গানপাউডার তৈরির জন্য অপরিহার্য—সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্যে এর বড় ভূমিকা ছিল।
পশ্চিম দিক থেকে আবার আসত ভিন্ন ধরনের পণ্য। মধ্য এশিয়া ও পারস্য থেকে ঘোড়া আনা হতো, যা ভারতীয় শাসক ও অভিজাতদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। আফগান ও মধ্য এশীয় বণিকরা নিয়ে আসতেন শুকনো ফল, বিশেষ করে বাদাম, আখরোট ও পেস্তাবাদাম। পাশাপাশি মূল্যবান পাথর, কার্পেট, ধাতব শিল্পপণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের কারুশিল্পসামগ্রী পূর্বাঞ্চলের বাজারে পৌঁছাত। ফলে এ মহাসড়ক কার্যত দুই ভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পণ্য বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এ বাণিজ্যিক করিডরের মাঝামাঝি অঞ্চল—বিশেষ করে পাঞ্জাব ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব—নিজস্ব উৎপাদনের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানে বিপুল পরিমাণ শস্য উৎপাদন হতো, যা দূরবর্তী অঞ্চলের খাদ্যচাহিদা মেটাতে সহায়তা করত। পাঞ্জাবের বস্ত্র শিল্প, চামড়াজাত পণ্য ও ধাতব কারুশিল্পও বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়ত। দিল্লি ও আগ্রা তখন কেবল রাজনৈতিক রাজধানীই ছিল না; এগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও বাণিজ্য বিনিময়ের কেন্দ্র। নানা অঞ্চল থেকে আগত পণ্য এখানে এসে লেনদেন হতো এবং সেখান থেকে আবার অন্যত্র পাঠানো হতো।
এ মহাসড়ক দিয়ে শুধু বিলাসপণ্যই পরিবাহিত হতো না; বিপুল পরিমাণ সাধারণ পণ্যও আদান-প্রদান করা হতো। অবশ্য উচ্চমূল্যের ও হালকা ওজনের পণ্য—যেমন মূল্যবান পাথর, সূক্ষ্ম বস্ত্র, মসলা বা অলংকার—স্থলপথে পরিবহনের ব্যয় সহজেই বহন করতে পারত। এসব পণ্যে ব্যবসায়ীরা বড় মুনাফা অর্জন করতেন, আর পথ নিয়ন্ত্রণকারী শাসকরা কর ও শুল্ক থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেতেন।
একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ শস্য ও কৃষিপণ্যও বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। মোগল প্রশাসনে অনেক সময় রাজস্ব শস্য আকারে সংগ্রহ করা হতো এবং তা প্রদেশ থেকে রাজধানীতে আনার জন্য এ পথ ব্যবহৃত হতো। দুর্ভিক্ষের সময়ও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্যশস্য সরিয়ে নেয়া সম্ভব হতো—যদিও তা সব সময় দ্রুত বা কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যেত না।
এ সড়কের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর অবকাঠামো। নির্দিষ্ট বিরতিতে সরাইখানা, বাজার ও নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকায় অন্য অনেক পথের তুলনায় চলাচল তুলনামূলক সহজ ছিল। ফলে মাঝারি মূল্যের পণ্যও দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহন করা সম্ভব হতো এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। (Romila Thapar, History of Early India: From the Origins to AD 1300)
সড়কটির অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল গভীর। কার্যত এটি সমগ্র উপমহাদেশকে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যুক্ত করে দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের বিশেষায়িত উৎপাদন গড়ে ওঠে এবং উদ্বৃত্ত পণ্য সহজেই অন্য অঞ্চলে পৌঁছতে পারে। ফলে পথের ধারে বহু শহর ও বাজার দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ী, কারিগর, মহাজনরা এসব কেন্দ্রে বসতি স্থাপন করেন।
এ মহাসড়ক লেনদেনের ব্যয়ও কমিয়ে দেয়। উন্নত অবকাঠামো ও তুলনামূলক নিরাপদ যাতায়াতের কারণে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়ে ওঠে, যার ফলে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বিস্তৃত হয়। একই সঙ্গে পথের ধারে কেন্দ্রীভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শাসকদের জন্য কর আদায় সহজ করে তোলে এবং তা সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যয়ের বড় উৎসে পরিণত হয়।
কেবল পণ্য নয়, এ পথ দিয়ে দক্ষ শ্রমিকদের চলাচল, প্রযুক্তি ও কারুশিল্পের জ্ঞান বিনিময় এবং পুঁজির প্রবাহও সম্ভব হয়েছিল। ধীরে ধীরে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড একটি সাধারণ সড়কের সীমা ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রধান ধমনীতে পরিণত হয়।
গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ছিল কেবল বাণিজ্যের পথ নয়; এটি ছিল ধারণা, বিশ্বাস, শিল্প ও জ্ঞানের চলাচলের এক বিশাল করিডোর।শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ সড়ক দিয়ে ধর্মীয় চিন্তা, শিল্পরীতি, প্রযুক্তি ও ভাষার আদান-প্রদান ঘটেছে, যার ফলে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।
ধর্মীয় বিস্তারের ক্ষেত্রেও এ পথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৌদ্ধধর্মের বিস্তার তার একটি বড় উদাহরণ। বিহারের বোধগয়া ও নালন্দা অঞ্চল থেকে যে বৌদ্ধধর্মের উত্থান, তা উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এবং পরে মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে মূলত বাণিজ্য ও যাত্রাপথের মাধ্যমেই।
সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার পাশাপাশি প্রধান সড়কগুলোর পাশে শিলালিপি ও স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন। এসব স্থাপনা ধর্মীয় বার্তা প্রচারের পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবেও কাজ করত। ফলে বৌদ্ধ ভিক্ষু, তীর্থযাত্রী ও পণ্ডিতরা বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে ধর্মীয় ধারণার বিস্তার ঘটান।
পরবর্তী সময়ে ইসলাম উপমহাদেশে প্রবেশ করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে এবং সেই প্রবেশপথের সঙ্গে এ মহাসড়কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মুসলিম শাসক, ব্যবসায়ী ও সুফি সাধকরা উত্তর ভারত থেকে ধীরে ধীরে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেন। এর ফলে দিল্লি, লাহোরসহ বহু শহর ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পাঞ্জাবে পঞ্চদশ শতকে জন্ম নেয়া শিখ ধর্মের বিস্তারেও এ পথের গুরুত্ব ছিল। গুরু নানকের শিক্ষা প্রথমে লাহোর ও অমৃতসর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে বিভিন্ন গুরদুয়ারা ও ধর্মীয় কেন্দ্রকে যুক্ত করে একটি বিস্তৃত ধর্মীয় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। এ যোগাযোগ ব্যবস্থা তীর্থযাত্রা ও পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করে দেয়।
শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গভীর। শিল্পী, কারিগর ও স্থপতিরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত করতেন। মোগল যুগে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে যে শিল্পরীতি গড়ে ওঠে, তা সাম্রাজ্যের রাজধানী থেকে প্রাদেশিক শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমেই। স্থাপত্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়—মোগল ধারা স্থানীয় বৈচিত্র্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন রূপ নেয়।
মিনিয়েচার চিত্রশিল্প, বস্ত্র তৈরির কৌশল, ধাতব কারুশিল্প এবং অলংকারশিল্পও এ পথ ধরে বিস্তৃত হয়। অনেক শিল্পী এক দরবার থেকে অন্য দরবারে পৃষ্ঠপোষকতার সন্ধানে যেতেন এবং সঙ্গে নিয়ে যেতেন নিজেদের শিল্পরীতি ও কারিগরি দক্ষতা। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্প ঐতিহ্য একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন ধারা তৈরি করে।
প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ের ক্ষেত্রেও এ মহাসড়কের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী ও কারিগরদের নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যমে কৃষি প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি, ধাতুবিদ্যার জ্ঞান এবং নির্মাণ কৌশল বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাষাগত ক্ষেত্রেও এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের যোগাযোগের ফলে এক ধরনের সাধারণ যোগাযোগ ভাষা গড়ে ওঠে। মোগল প্রশাসনের সময় পারসি ভাষা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বাজার ও বাণিজ্যের ভাষা হিসেবে ধীরে ধীরে হিন্দুস্তানি ভাষার বিকাশ ঘটে।
এ পথ দিয়ে কবি, পণ্ডিত ও গল্পকাররাও এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত করতেন। ফলে সাহিত্যধারা, জ্ঞানচর্চা ও পাণ্ডুলিপির আদান-প্রদান সম্ভব হয় এবং বিভিন্ন শিক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে এক বিস্তৃত বৌদ্ধিক বিনিময়ের পরিবেশ তৈরি হয়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ইতিহাসে এক নির্মম ছেদ টানে—সীমানার কাঁটাতারে খণ্ডিত হয়ে যায় শতাব্দীর অবিচ্ছিন্ন যাত্রা। তবে পথের গুরুত্ব হারানোর গল্প শুধু একটি বছরের নয়; পরিবর্তনের সূত্রপাত শুরু হয়েছিল তারও আগে। ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশরা ভারতে আধুনিক রেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করলে দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের ধরন দ্রুত বদলে যায়। এ সময় ব্রিটিশ শাসনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি গঙ্গা উপত্যকা অঞ্চলে কলকাতা থেকে পাটনা, এলাহাবাদ হয়ে উত্তর ভারতের দিকে বিস্তৃত রেলপথ নির্মাণ করে।
অন্যদিকে পশ্চিম ভারতে গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলা রেলওয়ে বোম্বে অঞ্চলকে অভ্যন্তরীণ বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে একটি নতুন পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। কলকাতা, পাটনা, এলাহাবাদ ও দিল্লির মতো শহরকে যুক্ত করে যে রেললাইন তৈরি হয়, তা ধীরে ধীরে গঙ্গা উপত্যকার প্রধান পরিবহন করিডোরে পরিণত হয়।গরুর গাড়ি বা উটের কাফেলায় যে পণ্য আগে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ভ্রমণ করত, রেলগাড়ি তা কয়েক দিনের মধ্যেই দূরবর্তী শহরে পৌঁছে দিতে পারত
ফলে বাণিজ্যের বড় অংশ সরে যেতে থাকে রেলপথে আর প্রাচীন মহাসড়কটি ধীরে ধীরে নিজের বুকের সেই চেনা ভার হারাতে থাকে। একসময় যে পথে বাজারের ডাক, কাফেলার ঘণ্টা, অশ্বখুরের ধ্বনি আর যাত্রীর গল্প মিলেমিশে থাকত, যে পথে পণ্য গেছে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে, ধর্ম ছড়িয়েছে দূর দেশে, শিল্প ও ভাষা মিলেছে নতুন স্রোতে সেখানে ক্রমে নেমে আসে শতাব্দীর নীরবতা।





