পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার নিশ্চিত ও মজুতদারি রোধে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সারাদেশে অভিযান চালিয়ে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৯৭০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে পাট অধিদপ্তর। এ সময়ে সারাদেশে ৬৫৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়।
পাট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, ধান, চাল, ভুট্টা, চিনি ও সারসহ মোট ১৯টি পণ্য প্যাকেটজাত করতে পাটের তৈরি ব্যাগের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পাট অধিদপ্তরের পরিচালক উত্তম কুমার মন্ডল জানান, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব অভিযান চালিয়ে এ জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে আইন অনুযায়ী কয়েকজনকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ১০০টি অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০২১’ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১৯ ধরনের পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ বা বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি প্রধান।
এছাড়া আদা, রসুন, পেঁয়াজ, ডাল, মরিচ, হলুদ, ধনে, আটা, ময়দা, গুঁড়া দুধ, পোল্ট্রি ও ফিসফিডসহ মোট ১৯টি পণ্যের মোড়কে সরকার পাটজাত বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে বলেও জানান তিনি।
উত্তম কুমার মন্ডল বলেন, মূলত পরিবেশ সুরক্ষা এবং পাটের ব্যবহার বাড়াতে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
একইসঙ্গে পাটচাষি ও পাটকল মালিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার কমাতেও আইনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশের প্রত্যেক জেলা প্রশাসনের অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং পাট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সম্মিলিতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এ অভিযান পরিচালনা করে।
এ অভিযানের মাধ্যমে ১৯টি পণ্যে পাটের বস্তার ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা হয়। আইন অমান্য করলে জরিমানা, কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হয়।
পাট অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, মূলত পাট অধিদপ্তর ব্যবসার লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন এবং আইনটি বাস্তবায়নের কাজ করে থাকে। বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রায় ১১ হাজার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পাট অধিদপ্তর থেকে ১২ ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হয় এবং সেগুলো নবায়ন করা হয়। এগুলো হলো- পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক, কাঁচাপাট রপ্তানিকারক, পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারক, ইন্টারনাল ব্রোকার, এক্সপোর্ট ব্রোকার, পাক্কা বেলার, প্রেস মালিক (পাক্কা প্রেস), আড়তদার, কাঁচা বেলার, প্রেস মালিক (কাঁচা প্রেস), ডিলার অব জুট (গুদামসহ বা ছাড়া) এবং পাটজাত পণ্যের ডিলার লাইসেন্স।
তিনি আরও বলেন, পাটের মজুতদারি বন্ধেও নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। কোনো আড়তদার ৫০০ মণের বেশি কাঁচাপাট মজুত করতে পারবে না এবং এক মাসের বেশি সময় ধরে তা সংরক্ষণও করতে পারে না।
কোন আড়তদার এই নিয়ম অমান্য করলে তাকে জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি ওই মজুত পাট তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে বাজারে বিক্রি করতে হবে বলে মুচলেকাও নেওয়া হয়।
পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নুরুল বাসির বলেন, ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০২১’ পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে দেশে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
তিনি বলেন, এতে একদিকে পরিবেশ যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি জানান, দেশে উৎপাদিত পাট দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর কিছু অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। কাঁচাপাট প্রধানত ভারত ও পাকিস্তানে রপ্তানি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় মিল মালিকরা কৃষকদের পাটের দাম সময়মতো পরিশোধ করেন না। তাই কৃষকরা যাতে নগদ টাকায় পাট বিক্রি করতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে মিল মালিকদেরও মৌসুমে পাট কিনে সংরক্ষণ করতে হবে, না হলে অফ-সিজনে পাটের দাম বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, তবে দেশের নির্ধারিত এলাকায় পাটের বীজ ও সার সরবরাহের মাধ্যমে কৃষকদের উৎসাহিত করার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। তা না হলে তারা পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।





