fgh
ঢাকাবুধবার , ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

কওমি মাদরাসার ঐতিহাসিক রূপান্তর ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ২৯, ২০২৬ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ । ১ জন

​ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, পর্তুগাল এবং অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করার আগে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হতো। তখন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্ব দখল করার পর শিক্ষাব্যবস্থাসহ অন্যান্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনে।

ফলে মুসলিম সমাজের ধর্মনিষ্ঠ শ্রেণি এবং আলেম-ওলামারা স্বীয় উদ্যোগে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন। ইসলামী শিক্ষা অর্জন ফরজ হওয়ায় রাষ্ট্র যদি এগিয়ে না আসে, তবে ব্যক্তিগতভাবেই এর ব্যবস্থা করতে হবে।

​ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর:

​১৭৫৭ ও ১৮৫৭ সালের পর ইংরেজরা এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা বদলে দেয়। মুসলিমরা প্রথমে সংগ্রাম করলেও শেষ পর্যন্ত বিকল্প পথ বেছে নেয়। তারা শিক্ষা বিপ্লবের মাধ্যমে “ইংরেজ হটাও” আন্দোলন গড়ে তোলে। মোঘল আমলে শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলত। বিপ্লবী আলেম ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর সময়েও এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখনকার শিক্ষাক্রমে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল:

১. কুরআন-হাদিসের শিক্ষা: তরজমা, তাফসির ও ব্যাখ্যা।

২. আরবি সাহিত্য: কুরআন বোঝার সহায়ক হিসেবে।

৩. ইসলামী আইন ও নীতিশাস্ত্র: কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত।

৪. যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন: গ্রিক দর্শন ও মানতেক (যুক্তিশাস্ত্র)।

৫. গণিত: হিসাব-নিকাশ ও প্রশাসনিক কাজের জন্য।

৬. ফার্সি ভাষা: তৎকালীন রাষ্ট্রভাষা ও প্রশাসনিক কাজের মাধ্যম।

​এই বিষয়গুলো ‘দরসে নেজামী’ নামে পরিচিত ছিল। মোল্লা নিজামুদ্দিন সাহালবী এই দরসে নেজামীর রূপকার; তিনি ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহর সমসাময়িক ছিলেন। এই সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম পরবর্তীতে দারুল উলূম দেওবন্দসহ দক্ষিণ এশিয়ার কওমি মাদ্রাসাগুলো অনুসরণ করে। এই পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভেতর উপযুক্ত ইস্তেদাদ ও যোগ্যতা তৈরি হয়।

​এই সমৃদ্ধ শিক্ষাক্রম ইংরেজরা উৎখাত করে দিলে আলেমসমাজ দারুল উলূম দেওবন্দ, শাহী মুরাদাবাদ, সাহারানপুর প্রভৃতি স্থানে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলো দান-সহযোগিতা ও সামষ্টিক প্রচেষ্টায় পরিচালিত হতো, যাতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এড়ানো যায়।

​স্বাধীনতা-পরবর্তী অবস্থা:

​১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তান শাসনামলে মাদ্রাসা শিক্ষায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়নি। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দিলেও প্রকৃতপক্ষে এতে তেমন সুফল আসেনি। মাদ্রাসাগুলো ঐতিহ্যগতভাবে সরকারি সাহায্য নিতে চায় না, কারণ তারা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও পাঠ্যক্রমে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশঙ্কা করে।

​বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ:

​১. রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা: প্রতিবছর হাজার হাজার আলেম তৈরি হলেও তারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী বা নীতিনির্ধারণী স্তরে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

২. শিক্ষাক্রম সংস্কার: কুরআন-সুন্নাহর অপরিবর্তনীয় মূলনীতির পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন। গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করা জরুরি।

৩. সরকারি সহযোগিতা: রাষ্ট্রীয় সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত থাকতে হবে যে, মাদ্রাসার স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

৪. সামাজিক অবদান: আলেমসমাজ ইতিমধ্যে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন, তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাঁদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন।

​ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাবনা:

​ওলামা ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন করা।

​কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

​সরকারি চাকরিতে কওমি সনদের কার্যকর সমমান নিশ্চিত করা।

​রাষ্ট্রীয় নীতিতে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে আলেমদের পরামর্শক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

​উপসংহার:

ইসলামী শিক্ষার মৌলিক নীতি অপরিবর্তিত রেখে যুগের চাহিদা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করে মাদ্রাসা শিক্ষাকে গতিশীল করলে আলেম ও শিক্ষার্থীরা জাতীয় উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। সরকার ও আলেমসমাজের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই সংস্কার সম্ভব—যেখানে রাষ্ট্র সহায়তা করবে, কিন্তু হস্তক্ষেপ করবে না।

লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ