fgh
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট: বিপর্যয়ের শঙ্কায় মোবাইল নেটওয়ার্ক

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ২৩, ২০২৬ ১:৪৮ অপরাহ্ণ । ২ জন

সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-কে একটি চিঠির মাধ্যমে এই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংকটটি শুধু পরিচালনাগত সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এর ফলে মোবাইল অপারেটরদের বেস স্টেশন, ডাটা সেন্টার এবং সুইচিং সেন্টারগুলো সচল রাখতে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

অপারেটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে।

কোথায় কত জ্বালানি লাগছে
বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) সাইটগুলো সচল রাখতে প্রতিদিন ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন ব্যবহৃত হচ্ছে। ডাটা সেন্টার ও সুইচিং স্থাপনাগুলোতে প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল। গ্রিডের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে গুরুত্বপূর্ণ ডাটা স্থাপনাগুলোতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে।

গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা এবং বাংলালিংক—এই তিন কোম্পানির জ্বালানি তেল সবচেয়ে বেশি লাগছে। কেবল ডাটা সেন্টার পরিচালনাতেই প্রতিদিন ২৭ হাজার লিটারেরও বেশি ডিজেল ব্যবহার করছে এই তিন কোম্পানি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি ব্যবহারের এই চিত্রটি একটি ক্রমবর্ধমান কাঠামোগত দুর্বলতাকে তুলে ধরে—যেখানে দেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডাটা সেন্টারগুলো—যা মোবাইল ভয়েস ও ইন্টারনেট ট্রাফিকের সব রাউটিং, প্রক্রিয়াকরণ এবং নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার সতর্ক করে বলেন, “কোনও ধরনের বিঘ্নতা তাৎক্ষণিকভাবে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। ডাটা সেন্টারগুলো অপারেটরগুলোর ‘ব্রেইন’। যদি সেটি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে গোটা নেটওয়ার্ক অচল হয়ে যাবে।”

অপারেটররা জানান, ডাটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক প্রায় চার মেগাওয়াট। গ্রিডের বিদ্যুৎ না থাকলে বাধ্যতামূলকভাবে জেনারেটর চালাতে হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮ কোটি ৫০ লাখের বেশি

 মোবাইল গ্রাহক রয়েছে। ফলে টেলিযোগাযোগ সংযোগ ব্যবস্থা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংকটের প্রভাব
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি খুবই খারাপ অবস্থায় যেতে পারে। ইতোমধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহারকারী সেবার মানে অবনতি অনুভব করতে পারছেন, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের ব্যবহারকারীরা। সংকট অব্যাহত থাকলে এই বিঘ্ন শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। মোট ব্যবহারকারীর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী আংশিক বা সম্পূর্ণ সেবা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন।

সেবার মান কমার প্রাথমিক সংকেতগুলোর মধ্যে রয়েছে, বারবার কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট ও দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকা এলাকাগুলোতে ‘ব্ল্যাক জোন’ তৈরি হওয়া।

দুর্বল অবকাঠামো ও সীমিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে গ্রামীণ অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে অপারেটররা। বিটিআরসিতে দেওয়া চিঠিতে অ্যামটব জানায়, জ্বালানি ঘাটতির বাইরে থাকা লজিস্টিক সংকটও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে, জেলা পর্যায়ের জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন, ডিপো থেকে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, জরুরি জ্বালানি পরিবহনে আরোপিত বিধিনিষেধ ও টেলিযোগাযোগ স্থাপনাগুলোতে জ্বালানি মজুত হ্রাস। অ্যামটব সতর্ক করে বলেছে, এসব সীমাবদ্ধতার কারণে নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক পরিচালনা বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

টেলিযোগাযোগ খাতের নির্বাহীরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংকট কেবল সংযোগ ব্যবস্থার সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম এমন পরিস্থিতিকে টেলিযোগাযোগ খাতকে ‘ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা অপারেটরদের জেনারেটর নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সমন্বিত জ্বালানি লজিস্টিক ব্যবস্থা না থাকলে সাময়িক বিঘ্নগুলো স্থায়ী নেটওয়ার্ক ‘ব্ল্যাক জোন’এ পরিণত হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে।”

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমরা টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ চাই। ডাটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুতে অগ্রাধিকার চাই। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি পরিবহন সহজ করার ব্যবস্থা চাই। এসব ব্যবস্থা না নিলে লাখো ব্যবহারকারীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”

একই ধরনের কথা বলেছেন বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান। তিনি বলেন, “জ্বালানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা টেকসই না। টেলিযোগাযোগ খাতকে একটি জরুরি সেবা হিসেবে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়ে

ছে বাস্তব কার্যক্রমে সেভাবে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।”

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি সহজলভ্যতা নিশ্চিত না হলে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ভেঙে পড়বে।”

সংকটের কথা স্বীকার করে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, “কমিশন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য কাজ করছে।” তবে, টেলিযোগাযোগ খাতের নেতারা জোর দিয়ে বলছেন, এই সমন্বয়কে দ্রুত কার্যকর বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। নইলে পুরো ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, টেলিযোগাযোগ সংকট এখন বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি হুমকি হয়ে উঠছে।

ক্ষতির মুখে পড়তে পারে যেসব কাজ

ডিজিটাল ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থা, ই-কমার্স ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা, রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, সরকারের ডিজিটাল সেবা ও জরুরি সেবা। বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনও দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন অর্থনৈতিক ক্ষতি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং লাখো মানুষকে প্রভাবিত করে।

জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে অস্থিতিশীলতা টেলিযোগাযোগ খাতকে নজিরবিহীন চাপের মধ্যে ফেলেছে। সংকট নিয়েই কোনোভাবে চলছে এই খাত।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন