fgh
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান ও বইয়ের মর্যাদা

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ২৩, ২০২৬ ১২:৪৪ অপরাহ্ণ । ১ জন

প্রতি বছর ২৩ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব বই দিবস’ পালিত হয়। এই দিনটি বই, পাঠাভ্যাস, লেখক ও জ্ঞানের গুরুত্বকে মানুষের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। বই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সভ্যতার বিকাশ, চিন্তার প্রসার এবং মানবজীবনের অগ্রগতির মূল ভিত্তি।

​ইসলাম ধর্ম জ্ঞান অর্জনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে জ্ঞান অর্জনকে শুধু উৎসাহই নয়, বরং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই বই পড়া মুসলমানদের জন্য শুধু সাংস্কৃতিক কাজ নয়, বরং একটি ইবাদত ও নৈতিক দায়িত্ব।

​কোরআনে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব

ক. প্রথম নির্দেশ: পড়া (ইকরা)

আল্লাহ তাআলা বলেন— “পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আলাক: ১)।

এই আয়াত ইসলামের প্রথম ওহি। এটি প্রমাণ করে ইসলাম জ্ঞান, গবেষণা ও পাঠের ধর্ম। ‘ইকরা’ শব্দটি শুধু পড়া নয়; বরং বোঝা, চিন্তা করা এবং বিশ্লেষণ করার নির্দেশ দেয়।

খ. জ্ঞানী ও অজ্ঞ সমান নয়

আল্লাহ তাআলা বলেন— “যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরা আয-জুমার: ৯)।

এই আয়াত জ্ঞানীর মর্যাদা এবং অজ্ঞতার ক্ষতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সমাজের উন্নয়নে জ্ঞানই মূল শক্তি।

গ. জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া

আল্লাহ বলেন— “হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।” (সূরা ত্বহা: ১১৪)। এই দোয়া প্রমাণ করে যে জ্ঞান অর্জন কখনো শেষ হয় না; এটি আজীবন চলমান একটি প্রক্রিয়া।

​সহিহ হাদিসে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব

​১. জ্ঞান অর্জন ফরজ

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।” (ইবনে মাজাহ: ২২৪)। অর্থাৎ ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

​২. জ্ঞান অন্বেষণের ফজিলত

রাসূল (সা.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের উদ্দেশ্যে পথ অতিক্রম করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)। জ্ঞান অর্জন শুধু দুনিয়ার সফলতা নয়, বরং আখিরাতের মুক্তির মাধ্যম।

​৩. আলেমদের মর্যাদা

রাসূল (সা.) বলেছেন— “আলেমদের মর্যাদা সাধারণ মানুষের ওপর তেমন, যেমন পূর্ণিমার চাঁদ অন্যান্য তারকার ওপর।” (আবু দাউদ: ৩৬৪১; তিরমিজি: ২৬৮২)। জ্ঞানী মানুষ সমাজকে আলোকিত করে যেমন চাঁদ রাতকে আলোকিত করে।

​৪. আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী

রাসূল (সা.) বলেছেন— “নিশ্চয়ই আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী।” (আবু দাউদ: ৩৬৪১; তিরমিজি: ২৬৮২)। তাঁরা সম্পদ নয়, বরং জ্ঞান ও হিদায়াতের উত্তরাধিকার বহন করেন।

​৫. জ্ঞান ও ইবাদতের সম্পর্ক

রাসূল (সা.) বলেছেন— “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।” (সহিহ বুখারি: ৭১; সহিহ মুসলিম: ১০৩৭)। এটি প্রমাণ করে জ্ঞান অর্জন আল্লাহর বিশেষ দান।

​বিশ্ব বই দিবস ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

​বিশ্ব বই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বই শুধু কাগজে লেখা শব্দ নয়, ব

রং এটি জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং সভ্যতার ভিত্তি। ইসলামের দৃষ্টিতে বই ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মানুষ—

​আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে।

​ইতিহাস ও সমাজকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে।

​নৈতিক চরিত্র গঠন করতে পারে।

​দুনিয়া ও আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে পারে।

​ইসলামী ইতিহাসে জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগ

​ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানরা জ্ঞানচর্চায় বিশ্ব নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের গবেষণা ও বই আজও বিশ্বসভ্যতার সম্পদ।

​ইমাম বুখারি (রহ.): সহিহ বুখারি সংকলন।

​ইবনে সিনা: চিকিৎসা বিজ্ঞানের অমর গ্রন্থ ‘আল-কানুন ফিত-তিব’।

​ইমাম গাজ্জালি (রহ.): আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গ্রন্থ রচনা।

​আল-ফারাবি: দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ।

​এই ইতিহাস প্রমাণ করে মুসলমানদের উন্নতির মূল ভিত্তি ছিল বই ও জ্ঞানচর্চা।

​বই পড়ার উপকারিতা

​১. মানসিক বিকাশ: বই মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়।

২. নৈতিক উন্নয়ন: ধর্মীয় ও আদর্শমূলক বই মানুষকে সৎ ও চরিত্রবান করে।

৩. সামাজিক উন্নয়ন: শিক্ষিত জাতি উন্নত সমাজ ও সভ্যতা গড়ে তোলে।

৪. আত্মিক প্রশান্তি: কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আনে।

​বর্তমান সময়ে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা

​বর্তমান ডিজিটাল যুগে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে, যা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী আমাদের উচিত—

​প্রতিদিন কিছু সময় বই পড়া।

​কুরআন ও সহিহ হাদিস অধ্যয়ন করা।

​শিশুদের বই পড়ায় উৎসাহিত করা।

​গ্রন্থাগার ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা।

পরিশেষে

​বই হলো জ্ঞানের আলো এবং সভ্যতার ভিত্তি। ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ফরজ ও ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো বইকে জীবনের অংশ বানানো এবং সে অনুযায়ী জীবন গঠন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উপকারী জ্ঞান অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: কলাম লেখক-গবেষক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সোসাইটি।