ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে ভয়ানক সংকটের কবলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার। নতুন করে শ্রমিক পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুরসহ আশপাশের দেশে নতুন শ্রমবাজার কীভাবে উন্মুক্ত করা যায়, চলছে সেই চেষ্টা।
বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েও খুলতে পারেনি দেশটির শ্রমবাজার। বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যেও রয়েছে বিষয়টি।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২২-২৪ মেয়াদে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন শ্রমিক পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ১ জুন মালয়েশিয়া সরকার সব সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাড়া ফের সব সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগ শুরু করেছে দেশটি।
কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের বিবদমান দুই পক্ষের বিরোধের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা সম্ভব হয়নি।সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেন, জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে, যা দেশ ও দেশের জনশক্তি রপ্তানির জন্য বড় ক্ষতির কারণ। যারা উদ্যোক্তা বা যারা কাজ আনতে পারেন, তাদের জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে দ্রুত কাজে লাগানো জরুরি। তারা আরও জানান, যে কোনো দেশে জনশক্তি রপ্তানির জন্য একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে লোক পাঠাতে হবে।
বিগত ধাপে মালয়েশিয়া সরকার কলিং ভিসা দিয়েছে, শ্রমিক নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে, বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় নিয়োগানুমতি ও বিএমইটি ছাড়পত্র দিয়েছে। সরকার প্রয়োজনীয় ট্যাক্স নিয়েছে। দুই দেশের সব ধরনের অনুমোদনের ভিত্তিতে শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন। এই প্রক্রিয়া মেনে শ্রমিক পাঠানোর কারণে কারও সাজা হলে, এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, ‘আগের প্রক্রিয়াটা ভুল ছিল।’ আগের প্রক্রিয়া যদি ‘ভুল’ প্রমাণিত হয়, তাহলে সরকার যে অনুমতি দিয়েছে তাদের কাজও ভুল প্রমাণিত হবে।
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে বিষয়টি আসবে যে, ‘বাংলাদেশ সরকার শ্রমিক প্রেরণে অবৈধ কাজ করেছে; এখানে অর্থ ও মানব পাচার হয়েছে।’ তাহলে অপরাধী কারা? অবশ্যই দুই দেশের সরকার। এতে শুধু মালয়েশিয়ায় নয়; অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ যারা আমাদের শ্রমিক নেয়, তারা শ্রমিক নিতে রাজি হবে না।
এ ছাড়া টিআইপি র্যাংকিংয়ে আমরা আরও পিছিয়ে যাব। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর কারণে কোনো লাইসেন্স মালিকের বিরুদ্ধে সাজা হলে অন্য কোনো লাইসেন্সকেও ক্লিয়ারেন্স দিতে পারবে না। এসব কারণে আগামী দিনগুলোতে মালয়েশিয়ার শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ একটি মামলায় সাজা হলেই মানব পাচার ও অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে।
যদি এটা প্রমাণিত হয়, তাহলে মালয়েশিয়ার টিআইপিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তখন মালয়েশিয়া চাইলেও বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভিসা দিতে পারবে না। কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে কোন দলের সমর্থক—সেটা মালয়েশিয়া সরকার দেখবে না; তারা দেখবে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে তাদের টিআইপি র্যাংকিং নিচেনেমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, এবারও মালয়েশিয়ায় প্রায় একই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার। অতীতে শ্রমিক পাঠানোর কারণে ঢালাওভাবে সব রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত চলমান রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে মামলা করেছে।
মালয়েশিয়া সরকারও একাধিকবার চিঠি দিয়ে অপ্রমাণিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানায়। সরকারের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ওইসব মামলা প্রত্যাহার হয়নি। এখন এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানো হলে ফের মামলার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, মামলার কারণে প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলোর টিআইপি র্যাংকিং তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এতে শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য যারা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করছে, তাদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা। ইতোপূর্বে সিআইডির প্রতিবেদনেও মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘কোনো শ্রমিক মানব পাচার বা অর্থ পাচারের মামলা করেননি। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া গিয়েছেন, তারা সবাই কাজ পেয়েছেন। কারও অভিযোগ নেই।’
রেমিট্যান্স বেড়েছে ৭১ শতাংশ: বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বিগত ২০১৭-১৮ এবং ২০২২-২৪ দুই মেয়াদে ৭ লাখ ৫৪ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান হওয়ার ফলে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের দিক দিয়ে মালয়েশিয়া বর্তমানে চতুর্থ স্থানে উন্নীত হয়েছে।
মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির পরিমাণ যথাক্রমে ২০২১-২২ সালে এক হাজার ২১ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এক হাজার ১২৫ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক হাজার ৭৪৪ দশমিক ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিগত ধাপে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ফলে ২০২২-২৪ মেয়াদে (২২ মাসে) যেমন পৌনে পাঁচ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে, ঠিক একইভাবে ২০২১-২২-এর তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭১ শতাংশ রেমিট্যান্স বেড়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে থাকা প্রবাসীরা ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ডলারর রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
মালয়েশিয়ায় প্রবাসী শ্রমিকের ৪২ শতাংশ বাংলাদেশি: মালয়েশিয়ার সরকারি নথি অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে ১১ লাখ ৫ হাজার ২১৫ জন শ্রমিক নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৬ জন। শতকরা হিসাবে এই সংখ্যা ৪২ দশমিক ৭০ শতাংশ।
ওই সময়ের মধ্যে অন্যান্য সোর্স কান্ট্রির মধ্য নেপাল ৩ লাখ ১৭ হাজার ৫১১ জন, ইন্দোনেশিয়া ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫ জন, মিয়ানমার ৮০ হাজার ২২৯ জন, ভারত ৭৩ হাজার ৯৮৬ জন, পাকিস্তান ২৮ হাজার ৩২১ জন, ফিলিপাইন ১৪ হাজার ৩৪৭ জন, ভিয়েতনাম ২ হাজার ৮৯৭ জন, শ্রীলঙ্কা ২ হাজার ৯ জন, থাইল্যান্ড ৭৩১ ও চীন থেকে ৭৩ জন শ্রমিক নেয় দেশটি।
আরও শ্রমিকের বড় চাহিদা: মালয়েশিয়া সরকারের ২০২৫ সালের জাতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট জনশক্তির প্রায় ১৫ শতাংশ বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে থাকে। সে হিসাবে বর্তমানে দেশটিতে মোট বিদেশি ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৭৫৬ জন বিদেশি শ্রমিকের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে বিদেশি শ্রমিক প্রায় ২০ লাখ। বয়সজনিত কারণ ও ভিসা বাতিল করে শ্রমিকরা নিজ দেশে ফেরত যাওয়ায় আরও কিছু কোটা তৈরি হয়েছে।
সে হিসাবে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে দেশটির। আগামী ৬ বছরে সেটা ১২ লাখ বা তারও বেশি হতে পারে। ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রয়েছে। তবে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমারসহ অন্যান্য সোর্স কান্ট্রিগুলো শ্রমিক পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। এ সময়ে দেশগুলো অন্তত তিন লাখ শ্রমিক পাঠিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে শ্রমিক যেতে না পারায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে আটকে পড়া ১৮ হাজার শ্রমিক এখনো পাঠাতে পারেনি বাংলাদেশ।
ভবিষ্যতে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা: জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি থেকে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকার তাদের দেশের জনশক্তির কর্মসংস্থান বাড়াতে ২০২৬ সালের শেষ দিকে বিদেশি শ্রমিকের কোটা ১০ শতাংশ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে কমিয়ে আনার চিন্তা করছে।
এ ক্ষেত্রে এখনই মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো না গেলে ভবিষ্যতে সুযোগ কমে আসবে। এখনো দেশটির ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ৮০ শতাংশ দেশি ও ২০ শতাংশ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কৃষিসহ অন্যান্য সেক্টরে তিন ভাগের এক ভাগ ও দুই ভাগের এক ভাগ হারে শ্রমিক নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত বাজার খোলা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে।উচ্চ বেতনের সম্ভাবনা: মালয়েশিয়ায় বৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী রয়েছেন। নতুন নিয়মে বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমতির জন্য বেতন সীমা বাড়ানো হয়েছে। বিদেশি পেশাজীবীদের তিনটি ধাপে বিন্যাস করে বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরি-১-এর ক্ষেত্রে এখন থেকে ন্যূনতম মাসিক বেতন হতে হবে ২০ হাজার রিঙ্গিত, যা আগে ছিল ১০ হাজার।
এই উচ্চ বেতনভোগী কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ বছর দেশটিতে অবস্থানের অনুমতি পাবেন। অন্যদিকে, ক্যাটাগরি-২-এর ক্ষেত্রে বেতন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার থেকে ১৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত পর্যন্ত। এই স্তরের কর্মীদের জন্যও ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ রাখা হয়েছে ১০ বছর।
ক্যাটাগরি-৩-এর ওপর যেখানে আগে ৫ হাজার রিঙ্গিত বেতন ছিল, সেখানে নতুন সীমা ধরা হয়েছে ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত পর্যন্ত। এই ক্যাটাগরির কর্মীদের জন্য অবস্থানের সময়সীমা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের ভিসা বন্ধ রয়েছে। নতুন নীতি কার্যকর হলে যারা বর্তমানে সেখানে আছেন, তাদের একটি বড় অংশকে মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসতে হবে। তবে নতুন নিয়মে দেশটিতে উচ্চ বেতনে নতুন শ্রমিক যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যে কারণে বেশি সুযোগ: জনশক্তি রপ্তানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে সৌদি আরবের পর একমাত্র দেশ মালয়েশিয়া, যারা অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। জাপান, কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশে কাজের অনুমতি পেতে ভাষা জ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট কাজে দক্ষতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় অভিজ্ঞতা ছাড়া শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে। ফলে সেখানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে থাকা জটিলতাগুলো নিরসন করে দ্রুতই বাজার খোলা সম্ভব হলে অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েক লাখ দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো সম্ভব।
বড় বাধা মামলার পাহাড়: অতীতে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগ এনে প্রথমে মামলা করেন আলতাফ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী। এরপর ধারাবাহিক মামলা করে দুদক ও সিআইডি। মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে কয়েক দফায় অনুরোধ করেছে, যাতে দুই দেশের মধ্যে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ পর্যালোচনা করে তা প্রত্যাহার করা হয়।
এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য—মালয়েশিয়ায় মানব পাচার সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনের (টিআইপি রিপোর্ট) রেটিং উন্নত করা। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আজমান মোহাম্মদ ইউসুফ গত বছরের ২৩ এপ্রিল এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘মানব পাচার ও অর্থ পাচারের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ভিত্তিহীন এবং তা মালয়েশিয়ার সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।’ ওই সময় বাংলাদেশ সরকার দফায় দফায় অপ্রমাণিত অভিযোগের মামলাগুলো প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
বরং নতুন নতুন মামলা হয়েছে। ফলে মালয়েশিয়া পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে—এসব প্রত্যাহার না হলে তারা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে না। এখনো ব্যবসায়ীরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে এসব মামলাকে প্রধান কারণ বলে জানিয়েছেন।
নেপথ্যে ব্যবসায়ীদের বিরোধ: সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ সীমিত সংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়। বিগত ধাপে জিটুজি প্লাস চুক্তির আওতায় ১০১ এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক নেওয়া হয়। যারা ওই সময় সরাসরি শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ পায়নি তারা ১০১ এজেন্সিকে ‘সিন্ডিকেট’ নাম দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নানামুখী প্রচার শুরু করে।
ব্যবসায়ীদের এই বিরোধের কারণে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই বিরোধ দেশের শ্রমবাজারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিপর্যয় মোকাবিলায় শ্রমবাজার খোলা জরুরি: জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা কালবেলাকে বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার। এটা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া যুদ্ধ বন্ধ হলেও জ্বালানি তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। ফলে বিশ্বজুড়ে বড় সংকট তৈরি হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বহু শ্রমিক ফেরত আসতে বাধ্য হবে। যারা থেকে যাবেন, তাদেরও বেতন-ভাতা অনিয়মিত হয়ে পড়বে।
যা দেশের রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কা দেবে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন। এ অবস্থায় আমাদের বিকল্প উপায় হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে শ্রমিক পাঠানো। এ ক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় পাঠানো সম্ভব।
জাপানে শ্রমিক পাঠানো দক্ষতা অর্জনসহ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। দক্ষিণ কোরিয়াও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সীমিত সংখ্যক শ্রমিক নিয়ে থাকে। সিঙ্গাপুরের বাজার ছোট। সৌদি আরবের পর সবচাইতে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০২৪ সালের ১ জুন বাজারটি বন্ধ হওয়ার পর আমরা আর খুলতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আলতাফ হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেন। সিআইডি মামলাটির তদন্ত করে মিথ্যা বলে রিপোর্ট দেন। দুদক ও সিআইডিও আলাদা কিছু মামলা করেছে। গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আসার পর মালয়েশিয়া সরকারের নির্দেশে ওই দেশের এন্টিকরাপশন কমিশন বিষয়টি দীর্ঘ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়, সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া হয়েছে।
উত্থাপিত অভিযোগগুলো অসত্য। এরপরই মালয়েশিয়া সরকার দফায় দফায় বাংলাদেশকে অপ্রমাণিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে চিঠি দেয়। বাংলাদেশ সরকার থেকেও চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে এসব মামলার সত্যতা নেই, এগুলো প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার মামলাগুলো প্রত্যাহার করেনি।’
গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়গুলো অবহিত করেছি। মালয়েশিয়ান সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি মালয়েশিয়া সফর করতে পারেন। তার আগে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টরা মালয়েশিয়া সফর করে প্রকৃত অবস্থান দেখতে পারেন।
’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২২ থেকে ২০২৪ সালে যেসব শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। অতীতে এরকম স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নজির নেই। তারপরও দুঃখজনকভাবে বহু মামলা হয়েছে। এসব মামলার কারণে আমাদের ও মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক টিআইপি সূচক তলানিতে ঠেকেছে। এতে শুধু জনশক্তি রপ্তানিই নয়, দুই দেশেরই রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সব জটিলতা দূর করে দ্রুত শ্রমবাজার খোলার ব্যবস্থা করা উচিত।
বাজার খোলা বড় চ্যালেঞ্জ: জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. হাছানাত হুমায়ূন কবীর কালবেলাকে বলেন, ‘নতুন শ্রমবাজার খোলা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে নতুন নতুন শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি রয়েছে। নতুন শ্রমবাজার খুলতে আমরা কিছু কর্মপন্থা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশে উচ্চপর্যায়ের সফরের কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার জন্য ‘অপ্রমাণিত’ মামলা প্রত্যাহারের যে শর্ত মালয়েশিয়া সরকার দিয়েছে বা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে, ওই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অবহিত রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’
মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘সৌদি আরবের পর বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০১২ সালে সেটা ছিল জিটুজি পদ্ধতিতে। ২০১৬ পর্যন্ত সময় মাত্র ৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো সম্ভব হয়। ২০১৫ সালে বেসরকারি সব এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ায় পাঠানো হলে তারা ১০টি লাইসেন্সের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠোনোর অনুমতি দেয়। ওই সময় ২ লাখ ৭৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। তখনো অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের পর সেটা অসত্য প্রমাণিত হয়।
২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় সব রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়। তাদের মধ্য থেকে সরকারি বোয়েসেলসহ ১০১টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়। তারা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত পৌনে ৫ লাখ শ্রমিক পাঠায়। সীমিত লাইসেন্সের বিষয়টি মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে আমাদের পক্ষ থেকে নয়। এখানেও মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা চাই শ্রমবাজার খুলতে। যাতে শ্রমিকরা বৈধভাবে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ পায়।’
দ্রুত অগ্রগতির আশা প্রতিমন্ত্রীর: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বাজার সক্রিয় করার পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মালয়েশিয়াসহ বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো দ্রুত চালু এবং থাইল্যান্ডসহ নতুন বাজারে জনশক্তি রপ্তানির জটিলতা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
’ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কবে নাগাদ খোলা সম্ভব হবে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং দ্রুত ইতিবাচক অগ্রগতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে।’





