fgh
ঢাকামঙ্গলবার , ৩১ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

হামের প্রকোপ ও টিকার সংকট

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ৩১, ২০২৬ ১:১৯ অপরাহ্ণ । ৪৭ জন

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় এক মানবিক বিপর্যয়ের পদধ্বনি শোনা যাইতেছে। বলিলে অত্যুক্তি হয় না যে, যেই হারে শিশু মারা যাইতেছে তাহা কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় নহে, বরং আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গভীর ক্ষতেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল হইতে শুরু করিয়া রাজশাহী ও ময়মনসিংহের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিতে হামের কারণে শিশুদের মৃত্যুমিছিল ক্রমান্বয়ে বাড়িয়া চলিয়াছে! পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চলতি মাসেই হামে আক্রান্ত হইয়া ৪১ জন শিশুর মৃত্যু হইয়াছে, যাহার মধ্যে মহাখালী হাসপাতালেই প্রাণ হারাইয়াছে ২২টি শিশু।

অত্যন্ত সংক্রামক এই ব্যাধির এমন বিস্তার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে অভাবনীয় ও অত্যন্ত পীড়াদায়ক।উল্লেখ্য, হাম কোভিডের তুলনায় অধিক ছোঁয়াচে একটি ব্যাধি। ইহাতে আক্রান্ত একজন শিশু অন্তত ১৩ হইতে ১৮ জনকে সংক্রমিত করিতে সক্ষম। ইহা জীবাণুবাহিত শ্বাসনালির রোগ।

এই রোগ হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিসিজি টিকার হার সন্তোষজনক হইলেও এমআর-১ এবং এমআর-২ টিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিচ্যুতি রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া, ৯ মাস পূর্ণ হইবার পূর্বেই ৩৩ শতাংশ শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়া এক অশনিসংকেত। পুষ্টিহীনতা, মাতৃদুগ্ধ পানের অভাব এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি শিথিলতা পরিস্থিতিকে জটিল করিয়া তুলিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে।

সবচাইতে আশ্চর্যের বিষয় হইল, বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির যে ঈর্ষণীয় সাফল্য ছিল, তাহা আজ লজিস্টিক ও প্রশাসনিক জটিলতার আবর্তে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িয়াছে! ফলে কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, পিসিভি ও এমআরসহ ছয়টি জরুরি টিকার মজুত শূন্যে নামিয়া আসিয়াছে। টিকার মজুত কেন শূন্য হইল এবং কেন যথাসময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব হইল না, সেই প্রশ্ন দেখা দিয়াছে জনমনে।

জানা গিয়াছে, পূর্বতন স্বাস্থ্য কর্মসূচির কাঠামো পরিবর্তন ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার ফলেই ঘনীভূত হইয়াছে এই সংকট। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সহকারীর পদ শূন্য থাকা এবং পোর্টারদের বেতন বকেয়াজনিত অসন্তোষ টিকাদান কার্যক্রমকে পঙ্গু করিয়া দিয়াছে। বর্তমানে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করিয়াছেন যে, বিগত আট বৎসর যাবৎ দেশে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি কার্যকর ছিল না।

সরকার এখন ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করিতেছে, যাহা ইতিবাচক হইলেও প্রশ্ন থাকিয়া যায়—এতগুলি প্রাণ ঝরিয়া যাইবার পূর্বে কেন আমাদের টনক নড়িল না? হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সংকট ও শয্যাস্বল্পতা আমাদের চিকিৎসা অবকাঠামোর কঙ্কালসার অবস্থাকেই পরিস্ফুটিত করিতেছে।এই সংকট উত্তরণে অবিলম্বে টিকা আমদানির ব্যবস্থা করিতে হইবে। কেবল ঢাকা নহে, প্রান্তিক জনপদগুলিতেও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করিয়া বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষার আওতায় আনিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

মনে রাখিতে হইবে, শিশুদের জীবন লইয়া এই প্রকার অবহেলা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নহে। স্বাস্থ্য খাতের এই প্রশাসনিক স্থবিরতা ও অদূরদর্শিতার দায়ভার সংশ্লিষ্ট সকলকেই গ্রহণ করিতে হইবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হামে শিশুর মৃত্যুতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়াছেন। ইহার পাশাপাশি দুই মন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলাগুলি ঘুরিয়া পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়াছেন। তাহা ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের বড় বড় ১০টি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করিয়াছে। এই সকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ইত্তেফাকের রিপোর্ট অনুযায়ী অন্তত ১০টি জেলায় রোগটি ছড়াইয়া পড়িয়াছে।

তাই এই সকল জেলায় বিশেষ নজরদারি ও তদারকি করা প্রয়োজন। এখন হামসহ ১০ রোগের টিকার যে সংকট রহিয়াছে তাহা নিরসনে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। কেননা এই টিকাগুলি ঠিকমতো সরবরাহ ও প্রয়োগ করা না হইলে শিশুদের মধ্যে অন্য রোগও ছড়াইয়া পড়িবার ঝুঁকি তৈরি হইবে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হইয়াছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে। একইভাবে হামকেও নিয়ন্ত্রণে আনিতে হইবে। ইহাতে আক্রান্তের হার ক্রমান্বয়ে নামাইয়া আনিতে হইবে শূন্যের কোঠায়।