fgh
ঢাকাসোমবার , ৩০ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

জ্বালানিসংকট: সংযম ও নজরদারির অপরিহার্যতা

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ৩০, ২০২৬ ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ । ২ জন

বাংলাদেশ সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ফুয়েল স্টেশনগুলিতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং ‘ফুয়েল কার্ড’ চালুকরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণে তৎপর। এই সকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়; তথাপি প্রশ্ন থাকিয়া যায়-যুদ্ধ বা সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেই ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক নজরদারি কি যথেষ্ট হইবে? কারণ, আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হইয়া পড়িলে বিশ্বব্যাপী যখন জ্বালানি তেল দুষ্প্রাপ্য হইয়া উঠিতে থাকে, ঠিক সেই সময়ে জনগণের মধ্যে একধরনের ‘প্যানিক’ ছড়াইবার কারণে অবৈধভাবে তেল মজুতের মহোৎসব শুরু হইয়া যায়। অসাধু মুনাফালোভীরা নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ, তিন গুণ দামে খোলা বাজারে তেল বিক্রিতে তৎপর হইয়া উঠেন। অবৈধভাবে মজুতকৃত এই রকম হাজার হাজার লিটার তেল বিভিন্ন স্থান হইতে উদ্ধার বা জব্দ হইতেছে প্রতিদিন। অন্যদিকে, সাধারণ গ্রাহকরাও তেল লইয়া দেখাইতেছেন আরেক তেলেসমাতি! বিশেষত, বাইকাররা একাধিক ফুয়েল স্টেশন হইতে তেল কিনিবার পর উহা বাসাবাড়িতে মজুত করিয়া রাখিতেছেন। ইহার কারণেই কি দেশের বাজারে তেলের চাহিদা রাতারাতি ব্যাপক বৃদ্ধি পাইয়া পরিস্থিতি আরও নাজুক হইয়া উঠিতেছে না?

এই প্রসঙ্গে স্মরণ করিতে হয় করোনা মহামারির সময়কালের কথা। সেই সময় আমরা কী প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম? অনেকে প্রয়োজনের অধিক খাদ্য বা পণ্যসামগ্রী মজুত করিয়া রাখিতে শুরু করেন, যাহার ফলে গোটা দেশ সংকটের মধ্যে পড়িয়া যায়। এইবার জ্বালানি লইয়াও অনুরূপ প্রবণতা চলিতেছে। এই অর্থে, চলমান জ্বালানিসংকটকে ‘আর্টিফিশিয়াল ক্রাইসিস’ বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। কারণ, হিসাব বলিতেছে, দেশে যেই পরিমাণ সরবরাহ বজায় রহিয়াছে, তাহাতে জ্বালানি তেলের ঘাটতি পড়িবার কথা নহে।

এই অবস্থায় করণীয় কী? প্রথমত, অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। কেবল অভিযান পরিচালনা করিলেই চলিবে না; অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করিয়া একটি শক্ত বার্তা প্রদান করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয়ে জাতীয় পর্যায়ে ‘সচেতনতা আন্দোলন’ গড়িয়া তোলা অত্যাবশ্যক। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিহার, অফিস-আদালতের সময়সীমা পুনর্বিন্যাস এবং অধিক পরিমাণে গণ-পরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করিতে হইবে। উন্নত বিশ্বে ইতিমধ্যে ‘এনার্জি এফিশিয়েন্সি’ বা জ্বালানি দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হইতেছে, যাহা আমাদের জন্যও শিক্ষণীয়। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি অধিক মনোযোগ দেওয়ার সময় আসিয়াছে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও বায়োগ্যাসের মতো বিকল্প উৎসগুলিকে কাজে লাগাইয়া জ্বালানির উপর চাপ কমানো সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসরমান। চতুর্থত, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করাও জরুরি। একক উৎসের উপর নির্ভরশীল না থাকিয়া অনেক দেশ বিকল্প সরবরাহ চেইন গড়িয়া তুলিতেছে, সংকট মোকাবিলায় ইহা সহায়ক বিধায় আমাদেরকেও সেই পথে হাঁটিতে হইবে।সর্বোপরি, এই সংকট কেবল সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নহে; কারণ, ইহা একটি সমষ্টিগত চ্যালেঞ্জ। সর্বস্তরের নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণ, ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা এবং প্রশাসনের কঠোরতা-এই তিনের সমন্বয়েই কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে, বর্তমান জ্বালানিসংকট বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তাস্বরূপ; আর তাই ইহা মোকাবিলায় প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য। জাতীয় অর্থনীতি এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে ব্যক্তি পর্যায়ে জ্বালানির মজুত বন্ধসহ কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগই এই সংকট হইতে সকলকে রক্ষা করিতে পারে।