কিছু দৃশ্য শুধু বর্তমানকে ধারণ করে না, এক নিমেষে অতীত আর ভবিষ্যৎকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। বুধবার গাজীপুরের সাতাশ মৌজায় ঠিক তেমনই এক নজিরবিহীন ও আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলেন উপস্থিত জনতা।
দেশের প্রথম ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের মঞ্চটি তখন কেবলই একটি উন্নয়নকাজের সূচনাপর্ব ছিল না, সেটি রূপ নিয়েছিল ইতিহাস আর আবেগের এক অনন্য মোহনায়।
মঞ্চে তখন উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঠিক সেই মুহূর্তে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন একটি বিশেষ উপহার।
কোনো মহামূল্যবান সামগ্রী নয়, সেটি ছিল ১৯৭৮ সালের এক ঐতিহাসিক স্মারক চিহ্ন-যা বহন করছে প্রধানমন্ত্রীর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কর্মময় জীবনের স্মৃতি।
যেখানে থমকে গেল সময় : ১৯৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর। গাজীপুরকে ঢাকা জেলা থেকে আলাদা করে নতুন মহকুমা ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি স্মারকচিহ্ন অত্যন্ত যত্নসহকারে উদ্ধার করে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নিয়ে আসেন জেলা প্রশাসক।
উপহারটি হাতে নেওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অবয়বে এক অন্যরকম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদের প্রটোকল ছাপিয়ে তিনি যেন মুহূর্তের জন্য হয়ে উঠলেন কেবলই এক অনুগত পুত্র।
পরম মমতায় তিনি পিতার স্মৃতিবিজড়িত সেই স্মারকটি ছুঁয়ে দেখলেন। উপস্থিত সবাই দেখছিলেন, শক্ত হাতে দেশের হাল ধরা এই মানুষটি তার পিতার স্মৃতির স্পর্শ পেয়ে কতটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। যেন ৪৮ বছর আগের সেই দিনটি আর পিতার আদর্শের উপস্থিতি তিনি মনেপ্রাণে অনুভব করছিলেন।
একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ : সাধারণত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে প্রথাগত উপহার দেওয়ার চল থাকলেও, জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও চিন্তাশীল। উপহারটি পেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে নিজের আবেগ ও ভালোলাগা প্রকাশ করেন এবং এমন একটি স্মৃতিকাতর ও অর্থবহ উপহারের জন্য গাজীপুরের জেলা প্রশাসককে আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং সুধীসমাজের প্রতিনিধিরাও জেলা প্রশাসকের এই রুচিশীল ও দূরদর্শী চিন্তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। উপস্থিত অনেকেই মন্তব্য করেন, ইতিহাসকে এভাবে বাঁচিয়ে রাখা এবং একজন সন্তানের কাছে তার প্রয়াত পিতার স্মৃতিকে সযত্নে তুলে ধরার এই প্রয়াস সত্যিই প্রশংসনীয়।
সাতাশের এই মঞ্চটি গতকাল প্রমাণ করল, সময় চলে যায় কিন্তু ইতিহাস তার আপন কক্ষপথেই ঘোরে। ১৯৭৮ সালে যে গাজীপুরের ভিত্তি গড়েছিলেন পিতা, ২০২৬ সালে এসে সেই মাটিতেই পুত্রের হাতে পিতার স্মৃতি ফিরে আসা-এক পরম তৃপ্তির অধ্যায়।দিনের আলো যখন ফুরিয়ে আসছিল, তখন সাতাশের মাঠ ছাড়ছিল হাজারো মানুষ।
তবে সবার মুখে মুখে ফিরছিল উন্নয়ন প্রকল্পের কথার চেয়েও বেশি-মঞ্চের সেই পিতা-পুত্রের স্মৃতির মেলবন্ধনের গল্পটি। যা শুধু খবরের কাগজের পাতায় নয়, গাজীপুরবাসীর হৃদয়েও দাগ কেটে থাকবে দীর্ঘকাল।





