নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নয়ন ও জনকল্যাণ নিশ্চিতে আগামী বাজেটে বেশ কিছু সৃজনশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বিএনপি প্রশাসন– সেটিই কাম্য। এটাও অনুমান করা যায়, সরকারের আয় বাড়াতে মরিয়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন কর প্রস্তাব করবে; হতে পারে বেরসিক কায়দায়।
অর্থের প্রয়োজন মেটাতেই হয়তো, যেমন দেখছি সংবাদমাধ্যমের আলোচনা-সমালোচনায়; মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর পর্যন্ত অগ্রিম করারোপের চিন্তাভাবনা চলছে। চিন্তাটি সত্তর-আশির দশকের কিনা, বোঝা দরকার। কারণ সে সময় মোটরসাইকেল ছিল বিলাসী আইটেম।
আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের চোরাবালিতে আটকে আছি না! তাই উন্নত দেশের আলোকে ‘সম্পদ কর’ প্রস্তাবও আসতে পারে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। কর অবকাশ রহিতকরণ বা হ্রাস এবং করের বাইরে থাকা কৃষি ও পল্লিকর্মের মতো স্পর্শকাতর খাত বা ক্ষুদ্র উপার্জনকারীরাও নতুন করের জালে আটকালেই-বা ঠেকায় কে! রাজস্ব বৃদ্ধির তাগিদ বলে কথা এবং রাজস্ব সংস্কারও তো সেভাবে সম্পন্ন হয়নি।
তবে এ ধরনের আগ্রাসী কর ধার্য বা উত্তোলন করা বা না করার উভয় সংকট নতুন সরকারের জন্য হতে পারে এক রাজনৈতিক পরীক্ষা। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, বাজেটের মতো নির্ভেজাল অর্থনৈতিক বিষয়ে এত রাজনীতির কী দেখছেন?
উত্তর হচ্ছে, এবারের বাজেট উপস্থাপিত হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে। এই যুগে বাজেটসহ নানা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে রাজনীতির প্রভাব থাকবেই।
গণতান্ত্রিক বিশ্বে এটা স্বীকৃত যে, বাজেট সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে অর্থনৈতিক পদক্ষেপে রূপান্তরের হাতিয়ার। কিন্তু আমাদের দেশে এই বোঝাপড়া খুব কম।
করের সন্ধানে থাকা কর্মকর্তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় বসে হাজারো ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং খাতের মধ্যে দেখতে পারেন শুধু টাকা আর টাকা। মানে ব্যাপক করারোপের সুযোগ! ব্যাটারিচালিত যানের মতো বিতর্কিত কারবারে করের নানা উৎস আবিষ্কার করে অর্থমন্ত্রীও ‘ভেলকিবাজি’ দেখাতে পারেন বৈ কি!
দুঃখিত! সংসদ সদস্যরা বাজেট না বুঝলে বা বুঝতে আগ্রহী না হলে জাতির কী দশা হয়, তার নমুনা হলো শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই দেড় দশকে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) টাকার অধিক করদাতাদের অর্থ লুট। জাতীয় কোষাগারের অর্থ প্রভাবশালীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের সেই আর্থিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি কিন্তু ঘটেনি এখনও।
অন্যদিকে শিক্ষার মতো জনকল্যাণের নামে জাতীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে এমপিও নামক এক পদ্ধতিতে, যেখানে বেতনের বোঝা আছে; মানসম্পন্ন শিক্ষার গ্যারান্টি নেই।
ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের পর যেভাবে কার্ড দেওয়ার হিড়িক পড়েছে, তাতে বাজেটে দয়া-দাক্ষিণ্যের সংস্কৃতি উৎসাহ পেতে পারে।সরকারি অর্থ ব্যয়ের যথার্থতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাজনৈতিক কাজ এবং যে কাজটি জাতীয় সংসদের। বাস্তবে উল্টো আমাদের সংসদ সদস্যরা মনে করেন, বাজেট প্রণয়ন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একচ্ছত্র এখতিয়ার এবং করারোপ ব্যাপারটি এনবিআরের ‘বিজনেস’। অথচ সংবিধান মানলে সংসদের অনুমোদন ব্যতিরেকে এক পয়সা কর নেওয়ার অধিকার নেই এনবিআর বা কারোরই।
এনবিআর মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর ১০ হাজার টাকা অথবা এর অর্ধেক অগ্রিম কর প্রস্তাব করতেই পারে। কিন্তু শুধু এর বৈধতা দেওয়া নয়, দায়ও বর্তাবে জনপ্রতিনিধিদের ওপর। তাদের মাথায় রাখতে হবে– প্রায় ৫০ লাখ মোটরসাইকেলের অধিকাংশই চালায় তরুণরা, যে গোষ্ঠী ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের আন্দোলনে বুক চিতিয়ে লড়েছে, শহীদ হয়েছে।
এই তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরিপ্রার্থী, ফ্রিল্যান্সার ও সম্ভাব্য উদ্যোক্তা।
তাদের অনেকেই নিজের কর্ম ঠিক করছে এবং এদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালকরা নানা ধরনের কাজ করছে; বিভিন্ন খাতে অবদান রাখছে। নতুন কর তাদের কাছে যুক্তিগ্রাহ্য হবে কীভাবে?
এই তরুণদের প্রত্যাশা ছিল গণতান্ত্রিক সরকার বাজেটে এমন কিছু কর্মসূচি বা প্রকল্প নেবে যাতে তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং তারা একটি ন্যায়ভিত্তিক, কর্মচাঞ্চল্যের সমাজে আনন্দে বসবাস করবে।
সে রকম বাজেট প্রণয়নের নিরঙ্কুশ দায়িত্ব যদি ‘অর্পণ’ করা হয়ে থাকে শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত কিংবা অর্থনৈতিক চিন্তায় তাড়িত সমাজ ও রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের কাঁধে, তবে তারা চলমান আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতেই কাহিল হবেন এবং বিশেষ কৃতিত্ব দাবি করবেন।
বাজেটসহ যে কোনো সরকারি প্রণোদনা ও সুবিধাদি বণ্টনে আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিই শেষ কথা হলে ক্ষমতা কেন্দ্রের বাইরের মানুষ বঞ্চিতই থেকে যাবে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইকুইটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিউরশিপ ফান্ড’-এর সমর্থন নিয়ে গরুর ফার্ম করতে গেলে এক দাগে এত পরিমাণ জমির মালিকানার শর্ত প্রযোজ্য যে, পুরোনো জমিদার বা আধুনিক শিল্পপতি ছাড়া কারও পক্ষে আবেদন করাই কঠিন। এ যেন তেলা মাথায় তেল দেওয়ার আয়োজন!
মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর অগ্রিম করারোপ হবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্মঠ তরুণদের শায়েস্তা করার শামিল। সরকার বরং উদাহরণ হিসেবে বলি, রেস্তোরাঁ, দোকান, মার্কেট এবং অধিক রোজগার ও মুনাফাকারী ব্যক্তিদের কর বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকি দেওয়া রোধ করলে কমপক্ষে এক ট্রিলিয়ন পরিমাণ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে।
ফুটপাতে দোকান চালাতে নগর বা শহর কর্তৃপক্ষকে লাইসেন্স ফি এবং এনবিআরকে মূসক দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং সড়ক-মহাসড়কের টোল গ্রহণে সরকারি ভলান্টিয়ার নিয়োগ ও ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা হলে বৈধ কর্মসংস্থান হবে এবং চাঁদাবাজির সমুদয় অর্থ কোষাগারে চলে আসবে।
কর আদায়ে সরকারি দুর্নীতি কমাতে পারলে আশা করা যায়, মোটের ওপর অন্তত ৩০ শতাংশ রাজস্ব আয় বাড়বে। তাই বলে সরকারি যন্ত্রের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ক্ষতিপূরণ দেবে আইন ও নিয়ম মান্যকারী সভ্য মানুষেরা, সেটা কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য কোনো রাষ্ট্রীয় সমাধান?
২০২৬ সালে তারুণ্যের বাংলাদেশে ট্যালেন্ট হান্ট, উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশ, উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, মা ও শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিয়মানুবর্তিতা উন্নয়নের স্বার্থে ছাত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে আগামী বাজেটে
মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করা উচিত।
এসব প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে টাকা ধার করা প্রভাবশালীদের পকেটে টাকা দেওয়া এবং অদক্ষতা ও অপচয়ের ফলে বাজেটের অর্থ ব্যয়ের চেয়ে যে হাজার গুণ ভালো কাজ, তাতে সন্দেহ কার?
শেখ হাসিনা সরকারের ফেলে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধের অভিঘাতের দোহাই দিয়ে বাজেট বক্তব্যকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত করা যাবে, কিন্তু তাতে জাতীয় সমাধানের পথ থাকবে না; জনগণের উদ্দীপনা তো দূরের কথা। আজকের তরুণরা নেতৃত্বের কাছ থেকে নৈরাশ্যের বাণী শুনতে প্রস্তুত নয়।
খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক





