লাকী আক্তার
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:০৩
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে কার্যত গোপনে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বা ইংরেজিতে ‘ইউএস-বাংলাদেশ রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ নামে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তির প্রতিটি ছত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
যেমন, এই চুক্তির কৃষি-সম্পর্কিত শর্তগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত, যা বাংলাদেশের কৃষকদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেবে। চুক্তির শেষ অংশে বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছরে কী কী কৃষিপণ্য কিনতে হবে, তা বলা হয়েছে, আর্থিক মূল্যে যা গড়ে বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ধারা ৫,
উপধারা ৬, ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর বাংলাদেশকে কমপক্ষে সাত লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে গম, এক বছরে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার বা ২.৬ মিলিয়ন টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য এবং প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা ও অন্যান্য পণ্য কিনতে হবে। এখানে বাংলাদেশের সামর্থ্য কিংবা ইচ্ছা থাকা না-থাকা বিবেচ্য নয়। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি দামে হলেও এসব পণ্য বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কিনতে হবে।
তাদের লক্ষ্য হলো গম, সয়াবিন, তুলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কৃষিপণ্য যেন অবাধে বাংলাদেশের বাজার দখল করতে পারে। এ জন্য আমেরিকার গম, সয়াবিন, তুলা, ডেইরি, মাংসসহ প্রায় সব কৃষিপণ্য ধাপে ধাপে বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত হবে। কিছু পণ্য চুক্তি কার্যকরের দিন থেকেই (ইআইএফ ক্যাটেগরি) শুল্কমুক্ত,
আর কিছু পণ্যের শুল্ক ৫ বা ১০ বছরের মধ্যে (বি৫, বি১০) সম্পূর্ণ উঠে যাবে। সাড়ে চার হাজারের বেশি পণ্যে শুল্কছাড় আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার অস্থিতিশীল করে রাজস্বের ওপর ব্যাপক চাপ বাড়াবে। খাদ্যে সার্বভৌমত্বের ভিত্তিও তাতে নস্যাৎ হবে।
অ্যানেক্স ৩-এর অনুচ্ছেদ ১.৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এসপিএস ও টেকনিক্যাল রেগুলেশনকে নিজেদের ব্যবস্থার সমতুল্য হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য।
এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো রপ্তানি সনদপত্র বা ইলেকট্রনিক ডেটা এলিমেন্টে পরিবর্তনের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি নিতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর (যেমন বিএসটিআই) নিজস্ব মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে।
চুক্তির অনুচ্ছেদ ১.৬-এ বলা আছে, চুক্তি কার্যকরের ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ কোনো জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) ফসল বা পণ্য বাংলাদেশে পুনরায় পরীক্ষা, অতিরিক্ত লেবেল বা অনুমোদন ছাড়াই আমদানি ও বাজারজাত হতে পারে।
মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব পণ্য।
অনুচ্ছেদ ১.৭ বলা আছে, প্রক্রিয়াজাত করলে সেই পণ্যকে ‘নন-লিভিং’ বলে চিহ্নিত করে জৈব নিরাপত্তা আইনের আওতা থেকে বের করে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জৈব নিরাপত্তা বিধিমালা (বায়োসেফটি প্রটোকল) অকার্যকর হবে। দেশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জিএম সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা প্রবেশ করবে।
দেশীয় বীজের ভান্ডার বিনষ্ট হবে। কৃষক জিএমও বীজের ওপর নির্ভরশীল হবে, বীজের বৈচিত্র্য কমে যাবে। এতে বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর কাছে দেশ জিম্মি হয়ে পড়বে।
অনুচ্ছেদ ১.৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ডেইরি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সমতুল্য স্বীকৃতি দেবে এবং ইউএসডিএর স্যানিটারি সনদপত্রেই ডেইরি পণ্য আমদানি করতে পারবে। কোনো স্থানীয় ফ্যাসিলিটি নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই। মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রেও ইউএসডিএর এফএসআইএস সনদপত্রই যথেষ্ট হবে।
চুক্তির বলে গ্রোথ হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত আমেরিকান গরুর মাংস বা দুগ্ধজাত পণ্য সহজেই দেশের বাজার দখল করবে। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মাংস আমদানি করলে একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকবে, অন্যদিকে দাম কমে গেলে বাংলাদেশের মাংসের বাজারেও ধস নামবে। বিপুল মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে এবং গ্রামীণ কৃষির বিপর্যয় ঘটবে। এর মধ্য দিয়ে দেশীয় গবাদি পশুর সংকট দেখা দেবে কৃষক ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে।
অনুচ্ছেদ ১.৮ (এইচপিএআই) অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকরের ১৮০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড ফ্লু আক্রান্ত এলাকার স্বীকৃতি রাজ্য পর্যায় থেকে ১০ কিলোমিটার জোনে নামিয়ে আনবে। অর্থাৎ ১০ কিলোমিটার এলাকার বাইরে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বার্ড ফ্লুমুক্ত’ ধরে নিতে হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের পোলট্রি রপ্তানি উপযুক্ততা নির্ধারণ করবে ইউএসডিএ-এপিএইচআইএস; বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ নয়। দেশীয় পোলট্রি খামারিরা এই ধারার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তা ছাড়া বাংলাদেশেরই এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগের সুযোগ থাকবে না।
অনুচ্ছেদ ১.১০ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যেখানে নিজস্ব কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের সর্বোচ্চ মাত্রা (এমআরএল) নির্ধারণ করেনি, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহনশীলতা (টলারেন্স) বা কোডেক্স এমআরএল স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে।
কোনো পণ্য এমআরএল লঙ্ঘন করলেও শুধু সেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, সব মার্কিন পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যাবে না। এর মধ্য দিয়ে বিএসটিআইর ভূমিকা খর্ব হবে। বিএসটিআই একটা নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
অনুচ্ছেদ ১.১১ (প্লান্ট অ্যান্ড প্লান্ট প্রডাক্টস মার্কেট অ্যাকসেস) অনুযায়ী, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নতুন উদ্ভিদপণ্যের বাজার প্রবেশের আবেদন জমা দেওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে প্রটোকল চূড়ান্ত করতে হবে।
এ ছাড়া পেস্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য ‘সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ (আইএসএম ১৪) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কৃষি-জীববৈচিত্র্য ও বীজ আইন অনুযায়ী কোনো পণ্য আমদানিতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও এ চুক্তির বেড়াজালে তা প্রায় অচল হয়ে যাবে। কৃষকদের দেশীয় বীজ এখানে সংকটে পড়ার শঙ্কা আছে।
অনুচ্ছেদ ১.১২ (ইম্পোর্ট লাইসেন্সিং)-এর ধারা ২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ শিপমেন্টের আগে কোনো খাদ্যপণ্য বা কৃষিপণ্যের জন্য আমদানি পারমিট বা এলসি খোলা বাধ্যতামূলক করতে পারবে না। ফলে নিম্নমানের, মেয়াদোত্তীর্ণ বা অস্বাস্থ্যকর মার্কিন কৃষিপণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগে বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে না।
পণ্য আসার পর তা আটকানোর আইনি জটিলতা আরও বাড়বে।
কার্যত এটি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা স্বার্থ হাসিলের ঔপনিবেশিক দলিল। এখানে বাংলাদেশের কৃষক, ভোক্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, সার্বভৌমত্ব– সবকিছু আমেরিকান কৃষি করপোরেশনগুলোর শর্তের বেড়াজালে ঢুকবে।
দেশের স্বার্থে বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে এ চুক্তি বাতিল করতে হবে। ইতোমধ্যে বামপন্থি, সমাজতন্ত্রী ও দেশপ্রেমিক জনগণ এ দাবিতে মাঠে সোচ্চার। সরকার তাতে সাড়া না দিলে জনগণ, সাধারণ কৃষক তাদের জীবনের তাগিদেই মাঠে নামতে বাধ্য হবে।
লাকী আক্তার: কৃষক নেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।





