আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫২ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:
এবারে বিদেশ ভ্রমণে অনবধানতায় নিউমোনিয়া বাধিয়ে ফেলি। নিউমোনিয়ার আগমনে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার আর ক্রিটেনিনেরও উল্লম্ফন দেখবার মতো। দেশে ফিরে সপ্তাহখানেক হাসপাতালবাসের পর এখন নিজ গৃহে বিশ্রামে। সকাল-বিকেল রান্নার জন্য একজন গৃহসহায়িকা আসেন। তিনি এক যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি একদম একা।
ছোট মেয়ে ও জামাতা সচরাচর ছুটির দিন আমার সঙ্গে থাকলেও আমার অসুস্থতায় তারাও রাতে আমার সঙ্গেই থাকছে। সকাল সাড়ে ৭টায় তাদের বেরুতে হয় কাজের জন্য, ফিরতে ফিরতে রাত ৮টা। মাঝে আমার দীর্ঘ সময়ের একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য মেয়ে-জামাইসহ অনেকেই উদগ্রীব।
আমাদের আবাসিক ভবনটি বিশাল; ১৭৮টি ফ্ল্যাট। সিকিউরিটি কমান্ডার আমার ফুটফরমাশ খাটা, প্রকারান্তরে আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এক কিশোরকে। সে আবার আমাদের ভবনেরই এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছেলে।
ছেলেটির বয়স বছর ১৩-১৪। শুধোলাম, পড়াশোনা করেছে কিনা! বলল, সেভেন পর্যন্ত পড়ে বাদ দিয়েছে। একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করছে। বললাম– কাপড়ের দোকানের কাজ ছাড়ছ কেন? আমি হয়তো দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে পুরো সুস্থ হয়ে যাব। তখন তো আর আমার তোমাকে লাগবে না। জবাবে বলল– কাপড়ের দোকানে কাজের সমস্যা হবে না।
চাইলেই কাজ শুরু করতে পারব। বললাম– বেশ, তবে আসার সময় বইপত্র সঙ্গে আনবে। আমার এখানে তেমন কাজ তো নেই। পড়াশোনা করতে হবে।
না, সে ছেলে আর আসেনি। রাতে মেয়েকে বলেছিলাম– ও-ছেলে আসবে না। কেননা, তাকে পড়ার কথা বলেছি। কথাটা সত্যি সত্যি মিলে গেল। রাতে প্রবাসী বড় মেয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলল– তোমার সাহস তো প্রশংসনীয়! স্কুল ছেড়ে দেওয়া কিশোরকে তুমি বাসায় রাখছ সঙ্গ দিতে! আদাবরের কিশোর গ্যাংকে কে না সমঝে চলে!
আমার দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। এই যে কিশোর, স্কুলে যার বই ফ্রি, মাসিক বেতন ন্যূনতম; যে কোনো দূরত্বের রিকশা ভাড়ার চেয়ে কম, পরীক্ষা পাসের শতভাগ গ্যারান্টি। তারপরও তারা স্কুল ছাড়ছে কেন! বেশির ভাগ মেয়ে ছাড়ছে বাল্যবিয়ের কারণে। বাল্যবিয়ে না হলে স্কুলে রয়ে যায় উপবৃত্তি পায় বলে।
ছেলেরা উপবৃত্তি পায় না। তাদের স্কুল ছাড়ার কারণ, পড়তে ভালো লাগে না; পিতামাতার দারিদ্র্য; প্রায়ই না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়; শিক্ষকরা কম মেধাবীদের প্রতি কম আগ্রহী। ফলে তারা স্কুলে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে যায়। লেখাপড়া করলেই চাকরিবাকরি হবে– এমন নিশ্চয়তাও নেই। নানান কারণে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে নিম্নবিত্ত কিশোররা।
স্কুলছাড়া এসব মানুষ কার মাথাব্যথার বিষয়? কোন মন্ত্রণালয়? স্কুল ছেড়ে যাওয়া এই কিশোরদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনায়াসে হাত ঝেড়ে ফেলতে পারে। শিক্ষার্থী না হলে তাদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কী-ই-বা দায় থাকে! নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কি কোনো দায় নেয় এদের জন্য? হয়তো নেয়, কিন্তু চোখে পড়ে না।
তাহলে কি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়? কিংবা কোনো দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ? সামগ্রিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া তাদের কেউ খোঁজে না। পুলিশ খোঁজে কোথায়ও তারা নিরাপত্তার হানি ঘটালে কিংবা নিরাপত্তার হানি ঘটাতে পারে, এই আশঙ্কায়। তা না হলে পুলিশও খোঁজে না।
এই কিশোররা স্কুল ছাড়ার পর প্রাকৃতিক নিয়মেই বড় হতে থাকে। কোনো লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে রাতের পর দিন হয়, তাদের বয়স বাড়ে। প্রাকৃতিক নিয়মে বয়স্ক হচ্ছে, সংসার করছে, সন্তান উৎপাদন করছে। অথচ সুনির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস নেই। কিশোর বয়সে কিশোর গ্যাং সদস্য। চুরি-ছিনতাই করে হাত পাকিয়ে সাহস বাড়লে ঘাতক। সাহসের ঘাটতি থাকলে রিকশা অথবা সাম্প্রতিককালের ‘টেসলা’ চালক।
গ্রামের মানুষ হলে জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে যাচ্ছেন। শিক্ষার অভাবে সেখানেও পদে পদে প্রতারিত। এমন শত শত তরুণ ইউরোপ যাওয়ার বাসনায় প্রায়ই ডুবে মারা যাচ্ছেন ভূমধ্য সাগরে অথবা কোনো গহিন বনে, অনাহারে। গ্রামগঞ্জে তৈরি হচ্ছে আরেক সংকট। তারা কৃষিকাজেও ফেরেন না। ফলে নিকট ভবিষ্যতে কৃষিকাজে অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
বছর ২০ পরেই দেশে জমি চাষবাসের ক্ষেত্রে ঘটবে ভিন্ন রীতির আগমন। জমিদার শ্রেণির মতো নতুন করে জমি চলে যাবে করপোরেট গ্রুপের হাতে। প্রান্তিক চাষিরা হারাবেন জমির মালিকানা।
প্রতিবছর এই মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এটা রোধ করতে না পারলে রাষ্ট্রের সব অর্জন একদিন ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। খুব সহজেই সামান্য অর্থের বিনিময়ে কোনো কোনো গোষ্ঠী তাদের কোনো প্রতিষ্ঠান বা সমাজের কোনো বিশেষ অংশের বিরুদ্ধে, এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।
বিদ্যমান মন্ত্রণালয়গুলোর কারোরই দায়িত্বে পড়ে না এসব মানুষ তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ করা বা তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। প্রাথমিকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নাম বদলে ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ করা হলে তখন দায়িত্ব নবগঠিত মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তাবে। আর তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয় স্কুলপড়ুয়া আর স্কুলত্যাগী সকলকে নিয়েই কাজ করবে পৃথক প্রক্রিয়ায়।
যেভাবেই হোক, রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে অনতিবিলম্বে এদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে মূলধারায়। কেউ কোনো কারণে সাধারণ শিক্ষায় আগ্রহী না হলে তাকে স্থানান্তর করতে হবে তার পছন্দের শিক্ষাক্রমে। মোদ্দা কথা, কমপক্ষে ১৮ বৎসর বয়স পর্যন্ত কেউ থাকতে পারবে না
শিক্ষাঙ্গনের বাইরে। এই উদ্যোগ যত দ্রুত নেওয়া যায় ততই মঙ্গল।
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব





