ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে নির্বাচনপূর্ব মাস জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর আমানত-প্রবাহে দেখা যায় উল্লেখযোগ্য ছন্দপতন। তবে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকগুলোয় আমানত বেড়েছে প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, যা ১১ শতাংশেরও বেশি। যদিও জাতীয় নির্বাচনের কারণে এই মাসেও ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, তবে তা আগের মাসের তুলনায় অনেক কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক পরিবেশের অস্থিরতা সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে এক ধরনের সতর্ক মনোভাব তৈরি করে। এর ফলে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নগদে রাখাকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। তবে নির্বাচনের পর এই প্রবণতা কমার বিষয়টি ইঙ্গিত করে মানুষ ধীরে ধীরে আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরে পাচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট গ্রাহক আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই আস্থার সংকট এতটাই গভীর হয়েছিল যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই অনিয়মগুলো প্রকাশ্যে আসতেই বেশ কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে যেমন ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, অন্যদিকে নতুন আমানত-প্রবাহও কমে যায়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে সুদের হার বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ এবং সংস্কারমূলক কার্যক্রম আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা জাগিয়ে তোলে। এর ফলে টানা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমানত বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল এবং মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসে; কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জানুয়ারিতে সেই ধারায় সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে।
তবে ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যান বলছে, আস্থা-সংকট কাটিয়ে ব্যাংক খাত আবার স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে এই ইতিবাচক প্রবণতা সামনে আরও জোরালো হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে সাময়িক অনিশ্চয়তার কারণে জানুয়ারিতে আমানতে কিছুটা চাপ দেখা গেলেও ফেব্রুয়ারি থেকে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নতুন সরকারের দায়িত্বগ্রহণ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরছে। সুদের হার সমন্বয়সহ বিভিন্ন পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে আমানত প্রবাহে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ব্যাংক আমানতে বড় উত্থান : বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সমাপ্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। সেটি জানুয়ারিতে ৬ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা কমে হয়েছিল ১৯ লাখ ৬৭ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা।
ফলে এক মাসে আমানত বেড়েছে ২৭ হাজার ৫২১ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। নির্বাচনের আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানত বেড়েছিল। এর মধে ডিসেম্বরে বেড়েছিল প্রায় ২০ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। নভেম্বরে বাড়ে প্রায় ২৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এদিকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল১৭ লাখ ৯২ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এই হিসাবে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ২২৯ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
আগের মাস জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশে। তার আগের মাস ডিসেম্বরে যেখানে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ী আমানতের প্রবৃদ্ধি উঠেছে ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশে। তবে চাহিদা আমানতের প্রবৃদ্ধি এখনও তুলনামূলক কম, মাত্র ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
যদি ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ী আমানতের তুলনায় চাহিদা আমানতে প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। এ মাসে চাহিদা আমানতে ২ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও স্থায়ী আমানতে হয়েছে ১ দশমিক ৩১ শতাংশ।ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বৃদ্ধির গতিও কমছে : জাতীয় নির্বাচনের কারণে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে টানা ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বাড়ছে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে সেই বৃদ্ধির গতি কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা।
ফলে ওই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। জানুয়াারি মাসে ৭ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা বেড়ে সেটি ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে ৩ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। সবমিলে ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা।
এদিকে গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৫ মাস ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমেছিল। যেমনÑ গত বছরের জুলাইয়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, যা কমে আগস্টে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা, অক্টোবরে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা ও নভেম্বরে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকায় নামে।





