fgh
ঢাকাশনিবার , ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

কৃষিজমিতে সৌরশক্তি এবং খাদ্য ও জ্বালানির ভবিষ্যৎ

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ১১, ২০২৬ ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ । ৭ জন

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত, যেখানে ক্রমবর্ধমান বৃহৎ জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কৃষি খাত শুধু গ্রামীণ জনগণের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে না, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

একই সময়ে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের মধ্যে সৌরশক্তি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সম্ভাবনাময়, কারণ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুকূল, পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং সারাবছর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সৌরবিকিরণ বিদ্যমান।

এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে কি কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব? প্রচলিতভাবে কৃষিজমিকে সৌরশক্তি অবকাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, কারণ প্রচলিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বৃহৎ খোলা জায়গার প্রয়োজন হয় এবং এটি খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয় যে উদ্ভাবনী ভূমি ব্যবহারের কৌশলের মাধ্যমে এই ধারণাগত সংঘাতকে একটি সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ, বিশেষ করে দেশীয় ও আদিবাসী ফসলের বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে, যেগুলো বহু প্রজন্ম ধরে মানববসতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে চাষ করা হয়ে আসছে। এই জীববৈচিত্র্য পরিবর্তিত পরিবেশগত অবস্থার সঙ্গে কৃষিকে অভিযোজিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।

অনেক ফসলের প্রজাতির আংশিক ছায়া সহ্য করার স্বাভাবিক ক্ষমতা রয়েছে এবং সঠিক নির্বাচন, প্রজনন এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন ফসলের জাত চিহ্নিত ও চাষ করা সম্ভব, যেগুলো কম সূর্যালোকেও ভালো ফলন দিতে সক্ষম। গবেষণায় দেখা গেছে যে বেশ কয়েকটি শাকসবজি ও পাতা জাতীয় ফসল সীমিত সূর্যালোকেও সফলভাবে বাড়তে পারে, যা সৌর প্যানেল ও ফসল উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয়ের সম্ভাবনাকে প্রমাণ করে।বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি ও পরিবেশগত পরিস্থিতি এ ধরনের সমন্বিত সমাধান অনুসন্ধান যে জরুরি, তা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।

জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়ন মডেল পরিবেশগত অবক্ষয়, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ এখনও আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা জাতীয় অর্থনীতিকে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে ফেলে। তাই একটি সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর অত্যন্ত জরুরি, এবং এই রূপান্তরের প্রধান ভিত্তি হিসেবে সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বৃহৎ পরিসরে সৌরশক্তি স্থাপনের জন্য এমন উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রয়োজন, যা ভূমি ব্যবহারের দক্ষতা সর্বাধিক করবে এবং একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনশীলতা সুরক্ষিত রাখবে।
এই ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হলো অ্যাগ্রো ফটো ভল্টায়েক বা এপিভি ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যেটি অ্যাগ্রি ভল্টায়িকস নামেও পরিচিত। এই ব্যবস্থায় একই জমিতে একযোগে খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়, যেখানে উপযুক্ত উচ্চতা ও দূরত্ব বজায় রেখে ফসলের ওপর সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়। এই ধরনের ব্যবস্থার নকশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্যানেলের উচ্চতা, ঢাল কোণ এবং প্যানেলের মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ধারণ করে নিচের ফসল কত পরিমাণ সূর্যালোক পাবে।

সঠিকভাবে নকশা করা হলে এপিভি ব্যবস্থা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষুদ্র জলবায়ু তৈরি করতে পারে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ের জন্যই উপকারী। উদাহরণস্বরূপ, সৌর প্যানেলের আংশিক ছায়া মাটির বাষ্পীভবন কমাতে, আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং গরম মৌসুমে অতিরিক্ত তাপের চাপ থেকে ফসলকে সুরক্ষা দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষাগুলো দেখিয়েছে যে দ্বৈত ব্যবহারভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা প্রদান করতে পারে। কৃষকদের কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিবর্তে সমন্বিত ব্যবস্থা তাদের একই সঙ্গে ফসল চাষ অব্যাহত রেখে বিদ্যুৎ থেকে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ দেয়।

বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে যে কৃষির সঙ্গে সৌরশক্তি উৎপাদন একত্র করলে ভূমির উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নত হয়। কিছু ক্ষেত্রে সৌর প্যানেলের উপস্থিতি চরম তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়িয়ে ফসলের ফলন আরও উন্নত করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা তাদের জমিতে সৌর প্যানেল স্থাপনের পর বাস্তব সুবিধা লাভের কথা জানিয়েছেন। এই সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে সেচের চাহিদা হ্রাস, খরা পরিস্থিতিতে ফসলের টিকে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা। সৌর প্যানেলের ছায়া একটি অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যা বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী–এমন অঞ্চলে উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে সহায়তা করে।

এই ফলাফল অ্যাগ্রিভল্টায়িকস ব্যবস্থার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে, যা একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম। এর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কম আলোতে ফসল দিতে সক্ষম ধান এবং অন্যান্য শস্য উৎপাদন। কানিহাটির গবেষণাগারে এমন কাজ চলমান।

বাংলাদেশে অ্যাগ্রো ফটোভল্টায়েক ধারণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। হাজীপুর ইউনিয়নকে একটি মডেল এলাকা হিসেবে ব্যবহার করে কৃষিজমিতে সৌর প্যানেল স্থাপনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের জন্য একটি পাইলট প্রকল্প তৈরি করা যেতে পারে। প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে যে স্ট্যান্ড অ্যালোন অ্যাগ্রি ফটোভর্টায়িক বা এসএপিভি ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, একই সঙ্গে ফসল উৎপাদন বজায় রাখে। এ ব্যবস্থা খাদ্য ও জ্বালানির সমন্বিত উৎপাদনের একটি টেকসই মডেল হিসেবে ভূমি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়িয়ে তোলে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ও জ্বালানি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া সৌরচালিত কৃষি ব্যবস্থা গ্রহণ জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ভূমির দ্বৈত ব্যবহারকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অ্যাগ্রো ফটোভল্টয়িক প্রযুক্তি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, কৃষকের আয় বাড়াতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের জন্য বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক এবং কৃষকদের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে স্থানীয়ভাবে উপযোগী নকশা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উন্নয়ন করা যায়।

সব শেষে বলা যায়, বাংলাদেশে সৌর বিকিরণ দ্বৈত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্ভব–একদিকে ফসল উৎপাদনের জন্য সালোক সংশ্লেষণকে সহায়তা করা এবং অন্যদিকে টেকসই উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। কৃষির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক নকশার মাধ্যমে সৌরশক্তির অবকাঠামো কৃষি কার্যক্রমকে পরিপূরক করতে পারে। কৃষিজমিতে সৌর প্যানেল সংযুক্ত করা বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি স্বনির্ভরতা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং স্থিতিশীল খাদ্য ব্যবস্থার দিকে একটি বাস্তবসম্মত পথ প্রদর্শন করে।

আবেদ চৌধুরী: জিনবিজ্ঞানী
তাহমিদ আনাম চৌধুরী, প্রভাষক, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়