ঢাকাসোমবার , ১ মে ২০২৩
  • অন্যান্য

ট্যানারির পরিবেশ, যা বলেন শ্রমিকেরা

অনলাইন ডেস্ক
মে ১, ২০২৩ ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ । ৭৩ জন
ছবি: সংগৃহীত

চামড়াশিল্প কারখানাগুলো একসময় ছিল রাজধানীর হাজারীবাগে, বুড়িগঙ্গা নদীর পারে। ছয় বছর আগে এটি চলে যায় রাজধানীর অদূরে সাভারের হেমায়েতপুরে, ধলেশ্বরী নদীর তীরে। মূলত বুড়িগঙ্গাসহ স্থানীয় পরিবেশদূষণ রোধ এবং শ্রমিকদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরি করতেই এ স্থানান্তর হয়।

এ চামড়াশিল্পের শ্রমিক হিসেবে প্রায় ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন টি এম লিয়াকত হোসেন। গতকাল রোববার লিয়াকত হোসেন বলছিলেন, ‘ট্যানারির শুধু স্থানান্তর হইছে কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয় নাই। ধলেশ্বরী নদী বুড়িগঙ্গার মতো হয়ে গ্যাছে। পরিবেশের উন্নতি হয় নাই। মালিকদের কিছু ভবন হইছে। শ্রমিকের অবস্থার পরিবর্তন দেখি না।’

সাভারের হেমায়েতপুরের ধলেশ্বরী নদীপারে হরিণধরা গ্রামে চামড়াশিল্প স্থানান্তর হয়েছে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে। এখন এটি বিসিক চামড়াশিল্প নগরী হিসেবে পরিচিত।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন সলিডারিটি সেন্টারের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, চামড়াশিল্প নগরের পারে প্রবহমান ধলেশ্বরী নদী ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। আর শ্রমিকেরা বলছেন, পরিবেশদূষণের প্রভাব পড়ছে তাঁদের স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, আয় ও কর্মপরিবেশের ওপর। শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে আজ ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।

ধলেশ্বরী নদীর পাশে প্রায় ১৯৯ একর জমিতে আছে চামড়া বা ট্যানারি শিল্পকারখানাগুলো। সেখানকার পরিবেশের বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। বিশেষ করে নদী ও সেখানকার বায়ুর দূষণ নিয়ে।

সলিডারিটি সেন্টারের ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্টস অন অ্যান্ড লেবার রাইটস কন্ডিশন অব ট্যানারি ওয়ার্কার্স’ শিরোনামের এ গবেষণা শেষ হয় গত বছরের ডিসেম্বর মাসে। এর নেতৃত্ব দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ। তিনি বলেন, ট্যানারি এলাকার পরিবেশ নিয়ে শ্রমিকদের ভাবনা ও শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব দেখাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য।

গবেষণার জন্য ১৮৮ জন শ্রমিকের ওপর সরাসরি জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক, দোকানি, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে দলভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে।

শুধু শ্রমিকের স্বার্থে নয়, বরং এ শিল্পের স্বার্থেই চামড়াশিল্পের পরিবেশদূষণ রোধ করা দরকার বলে মনে করেন সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এ কে এম নাসিম। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবেশের কারণে শ্রমিকেরাই বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন। এর প্রতিকার দরকার। তবে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের মধ্যে নেই বলেই মনে হয়।’

ট্যানারির পরিবেশ, যা বলেন শ্রমিকেরা

শ্রমিকদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ মনে করেন, ট্যানারির কারণে ধলেশ্বরীর পানির দূষণ হয়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৪ জন মনে করেন, নদীর পানির রং পরিবর্তন হয়ে গেছে। ৪৭ শতাংশের বেশি শ্রমিক মনে করেন, নদীর পানি গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী। শ্রমিকদের অনেকেই কারখানা এলাকায় এখন থাকছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশের মত, মাটির উর্বরতা কমে গেছে।

নদীর পাশাপাশি বায়ুদূষণও শ্রমিকদের উদ্বেগের বিষয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৮ শতাংশ শ্রমিক বলেছেন, বাতাসে এখন দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।

শ্রমিকদের মধ্যে ৫০ ভাগের বেশি বলেন, পরিবেশগত সমস্যা তাঁদের কাজের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের কথা, অসুস্থতার কারণে তাঁরা কাজে অনুপস্থিত থাকেন বা থাকতে বাধ্য হন বা দেরিতে আসেন। এ কারণে প্রায় ২৬ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি কাটা হয়। শ্রমিকদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি জানান, পরিবেশগত দূষণের ফলে তাঁদের ব্যয় বেড়েছে। এর কারণ তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়ার ফলে খরচ বেড়ে যায়।

পরিবেশগত দূষণের জন্য ৭০ ভাগের বেশি শ্রমিক নানা সমস্যায় ভোগেন। এর মধ্যে আছে দুর্বলতা বোধ, শ্বাসকষ্টের সমস্যা। পাশাপাশি অ্যালার্জি, মাথাব্যথা ও জ্বরের মতো সমস্যা আছে। পরিবেশগত দূষণ তাঁদের খাদ্য গ্রহণের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শ্রমিকদের ৬৩ শতাংশের বেশি জানান, এতে তাঁদের ও পরিবারের সদস্যদের সমস্যা হয়। ক্ষুধামান্দ্য বা রুচি না থাকার সমস্যায় ভোগে অনেকেই।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে শ্রমিকদের ভাবনা

চামড়াশিল্পের তরল বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা সব সময় একটা বড় ভাবনার বিষয়। হাজারীবাগে যখন ট্যানারি ছিল, তখন পুরো বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ত। বুড়িগঙ্গার দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল হাজারীবাগ ট্যানারি। হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে গেলেও ট্যানারির শিল্পবর্জ্য পাশের ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হতো। ২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রতিবেদক রাতে গিয়ে দেখেন, সাভারের চামড়াশিল্প নগর থেকে রাতের আঁধারে ট্যানারির তরল বর্জ্য শিল্পনগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) থেকে পাইপ বসিয়ে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর।

গত বছরের অক্টোবর মাসে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় এবং দূষণের দায়ে ঢাকার সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর ১৯টি ট্যানারি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে চামড়াশিল্প নগরী আপাতত বন্ধ রাখার সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি। যদিও সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।

সলিডারিটি সেন্টারের গবেষণায় দেখা যায়, ৬৫ শতাংশের বেশি শ্রমিক জানান, ট্যানারির তরল বর্জ্য সিইটিপিতে যায়। তবে ২৭ শতাংশের দাবি, এসব পানি আসলে মেশে ধলেশ্বরী নদীতে। আর কঠিন বর্জ্যের ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশ শ্রমিক জানান, সেগুলো খোলা জায়গায় ফেলা হয়।

মালিক ও সরকারের কথা

ট্যানারিমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবেশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আগে ছিল, এখনো আছে। যেমন সিইটিপিকে আরও কার্যকর করতে হবে। এ নিয়ে আমরাও বলছি।’

তবে তরল বর্জ্য ধলেশ্বরীতে পড়ছে—এমন দাবি ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন শাহীন আহমেদ।

সলিডারিটির গবেষণায় পরিবেশদূষণে শ্রমিকদের ওপর প্রভাবের বিষয়টি উঠে এলেও তা মানতে রাজি নন হেমায়েতপুরের বিসিক শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পরিবেশের পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। কিছু সমস্যা থাকলেও সবাই মিলে এর উন্নতির চেষ্টা হচ্ছে।’

 

তবে ট্যানারি শ্রমিকদের কথা ভিন্ন। ট্যানারি শিল্পের শ্রমিক সংগঠন ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক বলছিলেন, ‘পরিবেশের দূষণের প্রভাব শুধু শ্রমিক নয়, এলাকাবাসীর ওপরও পড়েছে। এ শিল্প পুরোপুরি পরিবেশসম্মত এখনো হয়নি। এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন শ্রমিকেরা।’

চামড়াশিল্পের পরিবেশ এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক, পানিবিশেষজ্ঞ ফিরোজ আহমেদ  বলেন, এ শিল্পে নানা ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে হয় শ্রমিকদের। সেগুলোর ব্যবস্থাপনা যদি ঠিক না হয়, তবে তার প্রভাব শ্রমিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়াটা স্বাভাবিক। চামড়াশিল্প নগরীতে কঠিন বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে হয় না। সিইটিপিতেও সমস্যা আছে। এর প্রভাব নদীর ওপর পড়ছে।