ঢাকামঙ্গলবার , ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঘুমন্ত শহরে মৃত্যুর বিভীষিকা

ইনটারন্যাশনাল ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৩ ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ । ৫৮ জন

সোমবার ভোর। তুরস্ক ও সিরিয়ার বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘুমে। হঠাৎ প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দুই দেশ। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮। নিমেষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় দুদেশের হাজার হাজার ভবন। অন্তত পাঁচ হাজার বহুতল ভবন মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ঘুমেই চিরঘুমে চলে যান অন্তত ২৬০০ মানুষ। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে আরও প্রায় সাড়ে ১২ হাজার লোককে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে দুদেশের সরকারি কর্তৃপক্ষ। এএফপি, বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সি।

তুরস্কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বলেছে, দেশটিতে ৮ দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প এটি। সিরিয়ার আলেপ্পো এবং হামা শহর থেকে তুরস্কের দিয়ারবাকির পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৩৩০ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত আন্তঃসীমান্ত এলাকায় আঘাত হানে এ ভূমিকম্প। প্রথম কম্পনের ১১ থেকে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার কেঁপে ওঠে ওই দুদেশসহ লেবানন ও সাইপ্রাসের বিভিন্ন অংশ। পরে দুপুরের দিকে আবারও আঘাত হানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প। দফায় দফায় ভূকম্পনে তছনছ হয়ে যায় দেশ দুটির বৃহৎ এলাকা। তৈরি হয় মানবিক বিপর্যয়। আরও ভূকম্পনের আশঙ্কায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়-মাঠে, খোলা আকাশের নিচে দুর্বিষহ ক্ষণ পার করছেন। বিভিন্ন দেশ থেকে দুই দেশে মানবিক সহয়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিশ্বনেতারাও শোক জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, তুরস্কে আঘাত হানা ভূমিকম্পের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১০টিরও বেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে একত্রিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইসরাইল, রাশিয়া এবং চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেছেন, ‘এটি একটি ভয়ংকর ট্র্যাজেডি।’ অন্যদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ একে স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগ বলেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তিনি।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, স্থানীয় সময় সোমবার ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। কম্পনের উৎসস্থল দক্ষিণ তুরস্ক। গাজিয়ানতেপ প্রদেশের পূর্বদিকে নুরদাগি শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার পূর্বে ভূগর্ভের প্রায় ১৮ কিলোমিটার গভীরে।

ভূকম্পনের পর বিপর্যয় মোকাবিলা সংস্থা এবং দমকল কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। বাংলাদেশ সময় সোমবার রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময়ও ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক উদ্ধারের খবর আসছিল। কোনো কোনো পরিবারে সব সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। শোক পালন করবেন এমন আত্মীয়-পরিজনও নেই অনেকের।
তুরস্কের আদানা শহরের বাসিন্দা আসলান বলেন, ভূমিকম্পের সময় আমরা প্রায় এক মিনিট ধরে দুলছিলাম। ভূমিকম্প থামার পর বাইরে বের হয়ে দেখতে পাই, আমার বাড়ির আশপাশের চারটি ভবন ভেঙে পড়েছে।

ভেবেছিলাম বাঁচব না। তাই বাড়ির সবাইকে ডেকে বলেছিলাম, চল আমরা একসঙ্গে এক রুমে মরি। তুরস্কের আরেক শহর গাজিয়ানটেপের বাসিন্দা এরদেম বলেন, ভূমিকম্পের সময় চারপাশ দুলছিল। দোলনায় দোলার মতো অনুভূতি হচ্ছিল।

৪০ বছরের জীবনে এমন ঘটনা দেখিনি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, তুরস্কের ১০টি প্রদেশে ১৬৫১ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১১ হাজার ১৬১ জন। অন্তত ২৮১৮টি ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত আছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৪৫টি দেশ তাদের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এক টুইট বার্তায় এরদোগান আরও বলেন, এটা ভয়ংকর ট্র্যাজেডি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠব। এদিকে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ। তিনি একে স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগ বলে উল্লেখ করেন।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৯৬৮ জনে পৌঁছেছে এবং ১২৮০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তবে দেশটির বিদ্রোহীগোষ্ঠী হোয়াইট হেলমেটস দাবি করেছে, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কমপক্ষে ২০৭ জন মারা গেছেন।

দুই অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার ভবন ধসে পড়েছে। তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াত ওকতে বলেছেন, তুরস্কের সাতটি প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর ইস্কান্দারউনে একটি হাসপাতাল ধসে পড়েছে। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যবশত একই সময়ে আমরা অত্যন্ত কঠিন আবহাওয়ার সঙ্গেও লড়াই করছি। এর মধ্যেই আমাদের উদ্ধারকাজ চলছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূকম্পনবিদ স্টিফেন হিকস বলেন, এর আগে ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই সময় ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহাণি ঘটেছিল।

এ ঘটনার পর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় এলাজিগ শহরে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ৪১ জন নিহত হয়েছিল। সে সময় আহত হয়েছিল এক হাজার ছয় শতাধিক মানুষ। অন্যদিকে সিরিয়ার জাতীয় ভূকম্পন কেন্দ্রের প্রধান রায়েদ আহমেদ রাষ্ট্রীয় বেতার স্টেশনকে বলেন, আমাদের এই কেন্দ্রের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প। ১৯৯৫ সালে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়।