ঢাকাবুধবার , ১ মার্চ ২০২৩
  • অন্যান্য

গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক
মার্চ ১, ২০২৩ ৫:০০ পূর্বাহ্ণ । ৮২ জন

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক কি টার্নিং পয়েন্টের দিকে যাচ্ছে? বাংলাদেশ নিয়ে যারা পর্যবেক্ষণ করেন, তারা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের তরফে উত্তেজনাপূর্ণ সব কূটনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ২০২১ সালের শেষে অনুষ্ঠিত এবং ২০২৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত নতুন মাসিক প্রকাশনা ‘সাউথ এশিয়া পারসপেক্টিভস’-এর উদ্বোধনী সংখ্যার ‘লিড স্টোরি’তে এমন মন্তব্য করে লেখা হয়েছে: উচ্চ পর্যায়ের কোনো মার্কিন কূটনীতিকের সর্বশেষ সফরটি ছিল ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সেলর ডেরেক শোলে ঢাকা এসে আবারো ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং একটি অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। মিস্টার শোলে বলেছেন, ‘বিশ্বের শক্তিশালী গণতন্ত্রের দেশগুলোর সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব। গণতন্ত্র কোথাও দুর্বল হয়ে পড়লে, সেটি আমাদের সহযোগিতার সক্ষমতাকে সীমিত করে দেবে।’ শোলের কয়েক সপ্তাহ আগে দুই দিনের সফরে ঢাকা এসে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ডোনাল্ড লু-ও শেখ হাসিনার সরকারের পাশাপাশি সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে একই ধরনের বার্তা দিয়েছিলেন। গণমাধ্যম বলছে- দুজনই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মার্কিন সমর্থন এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অব্যাহত সহযোগিতার উপর জোর দিলেও মানবাধিকার ইস্যু এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয় (তাদের বক্তব্যে) প্রধানভাবে ফুটে উঠেছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি. মাইলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া পারসপেক্টিভস’-এ বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে লেখা হয়েছে: ২০১১ সাল থেকেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র (ধীর ও অবিচলভাবে) অবক্ষয়ের সম্মুখীন, বিশেষ করে ২০১৪ সালে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরেই (দেশটি) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে ছিল। ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার সরকার অত্যন্ত কারচুপির নির্বাচন করেছে; যার ফলে তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং (দেশটিতে) দ্বিতীয়বারের মতো কার্যত একদলীয় সংসদ গঠিত হয়। তিনি নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ক্ষমতার চেয়ারে বসেছিলেন। ওই বিধান তিনি ২০১১ সালে সংবিধান থেকে বাতিল করে দেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উচ্চ মাত্রার অবিশ্বাস, ক্ষমতাসীনদের অধীনে কারচুপির নির্বাচনের ইতিহাস এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার অভাব বিবেচনায় অন্তর্বর্তী নির্দলীয় সরকারই ছিল নির্বাচনে জালিয়াতির বিরুদ্ধে একমাত্র রক্ষাকবচ। বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম এবং হেফাজতে মৃত্যু সহ মানবাধিকারের ব্যাপক ও গুরুতর লঙ্ঘন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নথিভুক্ত করেছে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে এবং ‘ড্রাকোনিয়ান’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অপরাধী বানিয়েছে। সম্প্রতি বিরোধী দলগুলোকে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি এবং তারা অব্যাহতভাবে আইনি ও বেআইনি হুমকির সম্মুখীন।

 

২০২১ সালের ডিসেম্বরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। এই সিদ্ধান্ত এটাই প্রমাণ করে যে, দেশটি আর শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় র‌্যাব হলো ‘ডেথ স্কোয়াড’ এবং বিরোধী দলের কর্মীদের অপহরণ ও হত্যার জন্য এটিকে যে ব্যবহার করা হয়েছে এমন সব মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। বাহিনীটি দায়মুক্তি ভোগ করে থাকে। পর্যবেক্ষকরা (বিষয়টিতে) জোর দিয়েছিলেন এই কারণে যে, তাদের জবাবদিহি করার প্রক্রিয়াগুলো প্রায় অস্তিত্বহীন। বাংলাদেশ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
র‌্যাবের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল প্রথম গণতন্ত্র সম্মেলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, যেখানে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৩ সাল থেকেই গণতন্ত্রের গুরুত্ব, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং অবাধ নির্বাচনের কথা বলে আসছে, তবে বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়গুলো অত্যধিক গুরুত্ব পেয়েছে। এটি কেবল একারণেই নয় যে, বাইডেন প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হলো গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার, বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারের দিকে দেশটির ক্রমবর্ধমান সরে যাওয়াও এর কারণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশটি (চীনের) বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ যোগ দেয় এবং তখন থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছে। চীনের অর্থায়নে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০২১ সালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত এই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস)তে যোগ দিলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ সরকার এখনো আইপিএসে যোগদানের বিষয়ে মার্কিন অনুরোধে সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকারের ক্রমাগত চীনের প্রতি ঝোঁকও কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থার প্রতি তার অনুরাগে বিশ্বাসী হওয়ার কারণ। রাশিয়ার সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্কও উষ্ণ হয়েছে। কারণ রাশিয়া ১২.২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। দুটি দেশই গুমের শিকার পরিবারের সঙ্গে (২০২২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর) দেখা করার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সমালোচনা করে। রাষ্ট্রদূত হাস সরকার সমর্থক একটি গ্রুপ দ্বারা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে ফোনে কথা বলার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি বলছে-অন্যান্য মার্কিন কূটনীতিকদের মতো সেক্রেটারি শেরম্যানও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের গুরুত্ব এবং মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার এডমিরাল এইলিন লুবাখার এবং জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক ব্যুরো’র সহকারী সচিব জুলিয়েটা ভালস নোয়েসের মতো অন্যান্য ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা যারা ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ঢাকা সফর করেছিলেন, তাদের বক্তব্যেও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সমুন্নত রাখার আহ্বান প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

উক্ত সফরগুলো এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগের জন্য বারবার আহ্বান জানানো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ স্পষ্ট। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের কৌশলগত যোগাযোগ সমন্বয়কারী জন কিরবি ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে দেয়া ব্যক্তিগত এবং অন-দ্য রেকর্ড ব্রিফিংয়ে সাউথ এশিয়া পারসপেক্টিভসকে বলেন, “আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সমর্থন করি যেখানে সমস্ত বাংলাদেশি উন্নতি করতে পারে, একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ পেতে পারে যেটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং দেশের নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থায় সকল বাংলাদেশির অংশগ্রহণের উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে।”

র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি, গণতন্ত্র সম্মেলন থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেয়া, উচ্চপর্যায়ের সব সফর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পরিবেশ তৈরির জন্য বারবার আহ্বানের কিছু ফলাফল বিগত মাসগুলোতে পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় মদতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনা কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সহ বিরোধী দলগুলোকে সমাবেশের জন্য কিছু সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো ২০১৪ সালে সুষ্ঠু নির্বাচনের গ্যারান্টি দেয় না। কারণ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং বেসামরিক প্রশাসনকে ক্ষমতাসীন দল নিজস্ব লক্ষ্যে ব্যবহার করতে থাকবে। তাছাড়া র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যে, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেছে এবং আরেকটি ‘পাতানো নির্বাচন’ আয়োজন করতে পারে।

এই পটভূমিতে, অনেকের চিন্তায় এটা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে চাপ বাড়াবে কিনা, যার মাধ্যমে ‘টার্নিং পয়েন্ট’-এর সংকেত পৌঁছবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ছোট ছোট পদক্ষেপ নেয়া চালিয়ে যেতে পারে এবং মূলত শেখ হাসিনা সরকারের ষড়যন্ত্রে পড়তে পারে। আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব বিবেচনায়, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যে, বর্তমান এই অবস্থা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম এবং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী পদক্ষেপ দেখতে চায় সে সম্পর্কে একটি স্পষ্ট সংকেত পাঠানো প্রয়োজন। আগামী মাসগুলোতেই বোঝা যাবে, হাওয়া কোন্ দিকে বইছে।