fgh
ঢাকাবুধবার , ৮ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

আমির হামজাদের নারীবিরোধী বক্তব্য চলতেই থাকবে?

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ৮, ২০২৬ ২:০১ অপরাহ্ণ । ১২ জন

জোবাইদা নাসরীন

 প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৫

গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের প্রতি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকে ডেইলি স্টারে খবর প্রকাশিত হয়েছে– এ সংসদে উপস্থিত আমি এবং আমার আরও দুজন নারী সহকর্মীর বিরুদ্ধে আরেকজন সদস্য যে কদাকার, কুৎসিত ভাষায় ওয়াজ মাহফিল করেছে, যে কুৎসিত ভাষায় বক্তব্য দিয়েছে, আমি আপনার কাছে এ ব্যাপারে বিচার চাইছি।’

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনি রুলস অব প্রসিডিওর পড়লে দেখবেন যে, সংবাদপত্রের রিপোর্টিং নিয়ে কোনো পয়েন্ট অব অর্ডার হয় না’ (সমকাল, ৩ এপ্রিল ২০২৬)। সংগত কারণেই সংসদে রুমিন ফারহানার এ বিচারের আর্তি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিচারের ‘রব’ তোলেন। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আমির হামজা এক ওয়াজ মাহফিলে সংসদে তাঁর কাছাকাছি বসা কয়েকজন পুরুষ সংসদ সদস্যের শারীরিক অবয়ব নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করছেন, যা বডি শেমিং পর্যায়ে পড়ে।

উপরন্তু তা করতে গিয়ে তিনি সংসদে তাঁর দুপাশে বসা রুমিন ফারহানাসহ কয়েক নারী সদস্যকে নিয়েও অশোভন মন্তব্য করেন। রুমিন ফারহানা ওই ঘটনারই প্রসঙ্গ তুলে স্পিকারের কাছে প্রতিকার চান। কিন্তু রুমিনের সে প্রত্যাশা আপাতত পূরণ হচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে।আমির হামজা জামায়াতে ইসলামীর নেতা। তিনি কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

এর আগে তিনি ওয়াজ মাহফিলের বক্তা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তবে আলোচনায় আসেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার পর প্রবল সমালোচনার মুখে তিনি ক্ষমা চান।
আমির হামজা নারীবিদ্বেষী বক্তব্য এই প্রথম দিলেন, তা নয়। নির্বাচনের আগে সিলেটে এক তাফসির মাহফিলে তিনি বলেছিলেন, ‘নেতা হবে পুরুষ। মহিলা নেতা হতে পারবে না’ (সমকাল, ১১ জানুয়ারি ২০২৬)। নির্বাচনের আগে কুষ্টিয়াতে নারীরা তাঁর বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল করেছিলেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক ওয়াজ মাহফিলে ভারতীয় এক অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন আমির হামজা। তখন অবশ্য এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিজেকে অসুস্থ হিসেবে দাবি করে তিনি লিখেছিলেন– ‘আমি স্বীকার করছি মানসিকভাবে আমি পুরোপুরি সুস্থ না।

শারীরিক ও মানসিক কোনো দিক দিয়েই আমি ফিট না। নিজের অজান্তেই অসংলগ্ন কথাবার্তা মুখে চলে আসছে। আমার আচরণও আমার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না’ (বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪)।

এবারও রুমিন ফারহানার উত্থাপিত বিষয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘দেড় ঘণ্টার আলোচনা ছিল। আমি কোথায়, কোন প্রেক্ষাপটে কী বলেছি, সেটা কি মনে রাখা সম্ভব? মিডিয়ার কি ফোকাস করার মতো আর গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নেই’ (দ্য ডেইলি স্টার, ৫ এপ্রিল ২০২৬)? তিনি এখানেও গুরুতর অভিযোগকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছেন।
অভিযোগটি গুরুতর। কারণ আমির হামজা সংসদের রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁর কয়েকজন নারী-পুরুষ সহকর্মীকে হেয় করেছেন।

তাদের বিরুদ্ধে জনমনে এক প্রকার বিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছেন। যে সংসদে একজন সদস্যকে আরেকজন সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাননীয় বলে সম্বোধন করতে হয়; কেউ মিথ্যা তথ্য দিলে ‘মিথ্যা’ শব্দটি এড়িয়ে বলতে হয়; তিনি ‘অসত্য’ তথ্য দিচ্ছেন সে সংসদে কোনো প্রমাণ ছাড়া এবং সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে। আমির হামজা অন্য সদস্যদের দুর্নীতিবাজ লেবেল দেন কীভাবে? আর তা করতে গিয়ে অশোভনভাবে নারী সদস্যদেরও টেনে আনেন কেন?
রাশমিকা প্রসঙ্গে তাঁর অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমির হামজা নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ দাবি করেছিলেন। এমন একজন কীভাবে সংসদ সদস্য হন? সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা বিচারে তাঁর তো প্রার্থিতাই টেকার কথা নয়।

ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। পশ্চাৎপদ এক সমাজে, বিশেষ করে যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী নিছক একটা ভোগ্যপণ্যের বাইরে কিছু নয়, তাঁর হয়তো কদরও বেশ। তাই হয়তো আমির হামজাদের মতো স্ব-স্বীকৃত ‘মানসিক অসুস্থ’ ব্যক্তিও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যে রাজনৈতিক দলের নেতা তিনি, সে দলের নেতাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলেন, নারীদের নেতৃত্বদানের যোগ্যতা নেই। এখন পর্যন্ত দলটি সংসদ নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। এ প্রেক্ষাপটেও আমির হামজার সংসদে পদার্পণ ব্যতিক্রম কিছু নয়।
বাংলাদেশে সারাবছর যেসব ওয়াজ মাহফিল হয়, তার সিংহভাগই নারীবিদ্বেষী বক্তব্যে ভরপুর থাকে। অনেক সময় শুক্রবার জুমার খুতবাতেও চলে নারীকে কেন্দ্র করে আপত্তিকর বক্তব্য। আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, বিচার করা তো দূরস্থান। নগরে আগুন লাগলে যেমন দেবালয় বাঁচে না, তেমনি সংসদও সাংস্কৃতিক ওই অধঃপতন থেকে রক্ষা পাচ্ছে না, যতই তা সকল নাগরিকের সম্মান-মর্যাদা সুরক্ষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার স্থান হোক।

সত্য, এর আগেও জাতীয় সংসদ নারীবিদ্বেষী এবং বডি শেমিং বক্তব্য শুনেছে। কিন্তু আমির হামজা এমন এক সংসদ সদস্য, যিনি সংসদের ভেতরে-বাইরে ধারাবাহিকভাবে এমন আচরণ করে চলেছেন। আজকে যদি তাঁকে থামানো না হয়, আগামী দিনে তিনি হয়তো দ্বিগুণ উৎসাহে, হয়তো সংসদে বসেই ওই অপকর্ম চালাবেন।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়