fgh
ঢাকাসোমবার , ৬ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

নতুন সরকারকে বিপদে ফেলতে অস্থিরতা তৈরির পেছনে কারা?

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ৬, ২০২৬ ১:৫০ অপরাহ্ণ । ১০ জন

বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত এবং নিয়মিত আমদানির প্রবাহ সচল থাকা সত্ত্বেও একটি বিশেষ মহলের উসকানিতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নতুন সরকারকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের প্রকৃত কোনো অভাব নেই, বরং ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে।

এই অস্থিরতার পেছনে বিরোধী দল জামায়াতসহ কুচক্রী মহলের ইন্ধন ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগ এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১১ দিনের (১,২৮,৯৩৯ মেট্রিক টন)। এছাড়া অকটেন ৬-৭ দিন এবং পেট্রোল ৮-৯ দিনের মজুত রয়েছে। তবে এটি কোনো স্থির সংখ্যা নয়; প্রতিদিন নতুন জাহাজ বন্দরে ভিড়ছে এবং সরবরাহ লাইনে তেল যুক্ত হচ্ছে।

সরকার ইতিমধ্যে ১৭ লাখ মেট্রিক টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে বিকল্প পথে দ্রুত তেল আনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। সরকার হরমুজ প্রণালির জটিলতা এড়াতে লোহিত সাগর হয়ে সউদী আরব থেকে এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করছে বাংলাদেশ। এছাড়া দেশের পেট্রোল ও অকটেনের ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, ফলে এই দুটি জ্বালানির সংকটের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক মহল পরিকল্পিতভাবে এই সংকট তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করা হচ্ছে। জ্বালানি মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাইরেও অন্যান্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রতিনিয়ত তেল সংকট নিয়ে নানাভাবে প্রশ্ন করে সবসময় বিষয়টিকে আলোচনায় রাখা হচ্ছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, দেশের বিভিন্ন স্থানে আবাসিক এলাকা, এমনকি গোয়ালঘর থেকেও হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে দেখা যাচ্ছে একই মোটরসাইকেল নিয়ে সারাদিন বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে ড্রামে মজুত করছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত তেল নিতে গিয়ে ট্যাঙ্কি উপচে পড়ার দৃশ্যও ভাইরাল হয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি প্রয়োজনের জন্য নয়, বরং কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা।

বিগত কয়েকদিনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেশব্যাপী সাড়াশি অভিযান এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম মজুতের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে জেলা প্রশাসন, র‍্যাব ও পুলিশের বিশেষ অভিযানে সারা দেশ থেকে কয়েক লাখ লিটার অবৈধভাবে মজুতকৃত ডিজেল ও অকটেন জব্দ করা হয়েছে।

বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ ও উত্তরবঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর সফরের পরপরই বড় দুটি সিন্ডিকেট ধরা পড়ে এবং বিভিন্ন গোপন গুদাম ও বসতবাড়ি থেকে কয়েক হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়; অন্যদিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপা ও কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আইনমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির পর মাটির নিচে ও গোয়ালঘরে লুকিয়ে রাখা কয়েকশ ড্রাম তেল উদ্ধার করেছে প্রশাসন।

এছাড়া ঢাকার ডেমরা, কেরানীগঞ্জ ও সাভারের মতো শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অকটেন ও পেট্রোলের অবৈধ মজুত ধরা পড়েছে, যা প্রমাণ করে যে একটি অসাধু চক্র পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে জ্বালানি সরিয়ে রেখে বাজারে এই কৃত্রিম সংকট ও অস্থিরতা তৈরি করেছে।

অভিযানে দেখা গেছে যে, কেবল ব্যবসায়ীরাই নয়, একটি নির্দিষ্ট চক্র সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে ছোট ছোট ড্রাম ও প্লাস্টিকের বোতলে তেল মজুত করছিল। অনেক জায়গায় আবাসিক ভবনের বেজমেন্ট এবং গ্রামের নির্জন পরিত্যক্ত ঘরে হাজার হাজার লিটার তেলের মজুত পাওয়াসরকারের নীতি-নির্ধারক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ দাবি করছেন, এই অঘোষিত ধর্মঘট এবং আতঙ্ক ছড়ানোর পেছনে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় ইন্ধন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’—এমন ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে দলটির ক্যাডাররা।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে বেশ কিছু স্থানে জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সন্দেহজনক গতিবিধি এবং তেল মজুতের প্রমাণ পেয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য বোরো সেচ মৌসুমে ডিজেল সংকট তৈরি করে কৃষকদের সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানো এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘যুদ্ধকালীন তৎপরতা’ শুরু করেছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “তেল সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী মজুতদার ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

”ইতিমধ্যে ৯টি জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে তদারকির জন্য ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় তেলের ব্যবহার কমাতে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য কিউআর কোড সিস্টেম চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ ৩০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা করা হয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জনগণকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল না কেনেন।

সরবরাহ চেইনে ১০-১২ দিনের একটি সাময়িক গ্যাপ থাকলেও তা পূরণে সরকার কাজাখস্তান ও মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি তেল আনছে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, “জ্বালানি তেলের বর্তমান হাহাকার সম্পূর্ণ কৃত্রিম। যারা তেলের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার পতনের বা অস্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই।

সরবরাহ স্বাভাবিক আছে, শুধু আতঙ্ক ও সিন্ডিকেট দমন করলেই এই সংকট কেটে যাবে।”সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন যখন মরিয়া, তখন একটি মহলের এই ‘রাজনৈতিক জুয়া’ সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মজুতদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।