নির্বাচনের আগে ফ্যাসিস্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির মাধ্যমে পুনর্বাসনের পাঁয়তারা চলছে। এতে করে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের অভিযোগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ছেলে ও পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্র নেপথ্যে এই পদোন্নতি ও পদায়নের কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এভাবে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টায় দুই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছে, যা পুলিশের বর্তমান চুক্তিভিত্তিক নেতৃত্বের কার্যক্রম ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছ
গোয়েন্দা সংস্থার একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, গায়েবি মামলা রুজু, বিরোধী দলকে নিপীড়ন-নির্যাতন, গুম-খুন, অপহরণ—এ ধরনের পেশাদারিত্ববহির্ভূত কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব প্রদান করেছেন এবং অধস্তনদের এসব কার্যক্রম সম্পাদনে বাধ্য করেছেন—এমন পুলিশ কর্মকর্তারা রয়েছেন পদোন্নতির তালিকায়। এছাড়া উক্ত ৬০ জনের ফিট তালিকায় প্রয়াত দেশনেত্রী ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারকালীন নেতৃত্ব প্রদানকারী ভাইরাল ভিডিওতে আলোচিত ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা ও জেসমিন আক্তার অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ তালিকায় রয়েছেন সাবেক আইজিপি বেনজীরের ক্যাশিয়ার, রাতের ভোটের কারিগর সাবেক এক আইজিপির অত্যন্ত আস্থাভাজন এলআইসি’র মাধ্যমে আড়িপাতা পুলিশ কর্মকর্তাও
পুলিশের একাধিক উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বুধবার ইনকিলাবকে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর এক মাসের কিছু বেশি সময় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দ্রুত ডিআইজি পদে পদোন্নতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর সে পদোন্নতির তালিকায় রয়েছেন ফ্যাসিস্ট পুলিশ কর্মকর্তারা, যারা পতিত আওয়ামী সরকারের সময় বিভিন্ন জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী দলের, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া তড়িঘড়ি করে বড় অংকের উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমেও এ কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ছেলে এর নেপথ্যে রয়েছেন। যেসব ফ্যাসিস্ট পুলিশ কর্মকর্তা নির্বাচনের আগে দ্রুত পদোন্নতি বাগিয়ে নিতে চান, তারা শীর্ষ কর্মকর্তার ছেলে ও পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্রকে ম্যানেজ করেছেন। নির্বাচনের আগে এ ধরনের পদোন্নতি দেওয়া হলে নির্বাচনের মাঠে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত দ্রুত এভাবে পদোন্নতি না দিয়ে বিষয়টি নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে দেওয়া, যাতে পরবর্তী সরকার পেশাদার, সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন—বলে ওই কর্মকর্তারা মন্তব্য করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বুধবার ইনকিলাবকে বলেন, পুলিশের ডিআইজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হয় এসএসবির মাধ্যমে। পুলিশ সদর দপ্তর এ ক্ষেত্রে শুধু প্রয়োজনীয় ফাইল তৈরি করে উপস্থাপন করে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কোনো অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ওঅ্যান্ডএম শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুল করিম, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের পক্ষে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে ১৫তম হতে ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিআইজি পদে পদোন্নতির নিমিত্ত ৬০টি সুপারনিউমারারি ডিআইজি (গ্রেড-৩) পদ সৃজন সংক্রান্ত পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা বরাবর একটি পত্র প্রেরণ করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে মঞ্জুরীকৃত ডিআইজি (গ্রেড-৩) পদের সংখ্যা ৮৭টি হলেও তার বিপরীতে মোট ১৩৭ জন ডিআইজি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ৫০ জন এখনো সুপারনিউমারারি ডিআইজি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। উক্ত ৫০ জন কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে স্থায়ীকরণের নিমিত্ত সাংগঠনিক কাঠামোতে পদসৃজনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে নতুনভাবে সুপারনিউমারারি পদ সৃজনের প্রস্তাবনা সাংগঠনিক কাঠামোতে জটিলতা সৃষ্টি করবে বলে পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন
চাকরিকাল ও বর্তমান গ্রেড বিবেচনায় মন্ত্রণালয়ে যে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে, তাতে ১৫তম ব্যাচের ২ জন, ১৭তম ব্যাচের ১ জন, ১৮তম ব্যাচের ৩ জন, ২০তম ব্যাচের ৪৯ জন এবং ২১তম ব্যাচের ৪৭ জনসহ মোট ১০২ জন কর্মকর্তার পরিসংখ্যান প্রদান করে তাদের ডিআইজি পদে পদোন্নতির যোগ্যতা পূরণ হয়েছে এবং তারা এ পদে প্রারম্ভিক বেতন স্কেলে উত্তীর্ণ হয়েছেন—মর্মে উল্লেখ করে সুপারনিউমারারি ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য মতামত প্রদান করা হয়েছে।
পত্রে উল্লিখিত ১০২ জন কর্মকর্তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা (বিভাগীয়/প্রশাসনিক/ওএসডি/সংযুক্ত/সাময়িক বরখাস্ত ইত্যাদি) থাকায় ৪২ জন বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৬০ জনকে পদোন্নতির নিমিত্ত ৬০টি সুপারনিউমারারি ডিআইজি (গ্রেড-৩) পদ সৃজনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস, ১৯৮১ অনুযায়ী ডিআইজি পদে পদোন্নতির পূর্বশর্ত হিসেবে ১৫ বছরের সন্তোষজনক চাকরিকাল থাকতে হবে, যার মধ্যে ৭ বছর পুলিশ সুপার পদে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রেরিত প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বোচ্চ চাকরিকাল ১৫তম ব্যাচের ৩০ বছর এবং সর্বনিম্ন চাকরিকাল ২১তম ব্যাচের ২২ বছর। অথচ ২২তম ও ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এতে করে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছে, যা পুলিশের বর্তমান চুক্তিভিত্তিক নেতৃত্বের কার্যক্রম ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।





