আমাদের দেশে প্রতিবছর বর্ষা এলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়তে হয়। অবশ্য এমনিতেও বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা-খরা, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি, বজ্রঝড়, পাহাড়ধস, নদীভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। বিগত সময়ের চেয়ে এই বছর মনে হচ্ছে সময়ের আগেই বৃষ্টিপাত বেশি হচ্ছে।
সাধারণত বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী ঝড় হয় এবং সেটা ক্ষণস্থায়ী হয়। তবে এবার কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে টানা বৃষ্টিপাতও হচ্ছে। অনেক জায়গায় শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। বজ্রপাতেও মারা যাচ্ছে মানুষ।
কয়েকদিন ধরে সারাদেশে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রামসহ অনেক এলাকায় বৈশাখের এই বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতাও শুরু হয়ে গেছে। হাওর অঞ্চল পানিতে ডুবে গিয়ে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, অনেক কৃষকের পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষক আহাজারি করছে ফসল হারিয়ে। থই থই পানিতে ডুবে গেছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। কৃষকের এই ক্ষতি অপূরণীয়।
অতীতেও দেখেছি কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হতে। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। সময়ের আগেই ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে অনেক এলাকা। ক্ষতি হচ্ছে পাকা ধান, ফসলের মাঠ।
এখনকার বাস্তবতা এ রকম, কৃষক ঠিক বুঝে উঠছে না তাদের কী করা উচিত! ঋতু পরিবর্তন, ফসল রোপণ, ফসল ঘরে তোলা এসব অভিজ্ঞতা যেন কৃষকের শত বছরের হিসাবকে উল্টাপাল্টা করে দিচ্ছে। কৃষক যেন দিশাহারা। কৃষিব্যবস্থা ও কৃষকের আর্থিক ক্ষতিপূরণ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আরও একটি বিষয় এবার লক্ষ করেছি। জমিতে ধান সময়মতো পাকলেও লোকের (শ্রমিকের) অভাবে কাটতে পারেনি। এটা একজন কৃষকের জন্য বড়ই কষ্টের ব্যাপার। পাকা ধান সময়মতো ঘরে তোলার জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
আমাদের দেশে যতগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় তার মধ্যে বন্যা অন্যতম। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতাও একটি মারাত্মক দুর্যোগ।
তবে জলাবদ্ধতা যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মনুষ্যসৃষ্ট। তবে বন্যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বেশির ভাগ সময়ই মোকাবিলা করা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বর্ষাকালের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন।
আমাদের দেশে বন্যা নানান কারণে হয়। বাংলাদেশ প্লাবন গঠিত সমভূমির দেশ। নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা জমা হয়ে এ দেশের বেশির ভাগ ভূমি গঠিত হয়েছে। বর্ষাকালে নদীর দুকূল প্লাবিত হয়ে পলায়নের মাধ্যমে প্লাবন এই ভূমি গঠিত হয়েছে। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, হঠাৎ বৃষ্টি এবং উজান থেকে পানির অতিরিক্ত প্রবাহ বাংলাদেশে বন্যার অন্যতম কারণ।
পাহাড়ি ঢলের কারণেও বন্যা হয়। বাংলাদেশে জুন-জুলাই মাসে বর্ষা ঋতুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে বন্যা হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে যে কোনো সময় বন্যা হতে পারে। বিগত বছরগুলোতে আমরা এমনটাই দেখেছি।
বাংলাদেশে এমনও বন্যা হয়েছে যখন ৬৪টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। আমরা ১৯৮৮ সালের বন্যায় এমনটা দেখেছি। ১৯৯৮ সালের বন্যাও ছিল ভয়াবহ। ২০২৫ সালে হঠাৎ বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় ১২টি জেলা বন্যাকবলিত হয়। বন্যার পানি ১২ থেকে ১৬ ফিট উচ্চতায় উঠে যায়। ফসল, বাড়িঘর, বিভিন্ন স্থাপনার মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মহাসড়কগুলো ডুবে গিয়ে যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সারাদেশের মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
আমাদের দেশে বন্যার কারণগুলো হচ্ছে- বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি, নদীগুলোর উজানে ব্যাপক বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ইত্যাদি। আরও একটি বিষয় হচ্ছে- নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস। বাংলাদেশের প্রায় সব নদী হিমালয়ের পাদদেশে সৃষ্টি হয়ে ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি হলে এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে।
তিস্তা ব্যারাজ, ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব সময় পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি আটকিয়ে দেয় আর বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি কোনোরকম আগাম সতর্কবাতা না দিয়েই ছেড়ে দেয়। এর ফলে বাংলাদেশ বন্যাকবলিত হয়। এবং এই বন্যার পানি নেমে যেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ক্ষয়ক্ষতি হয় মারাত্মক। ভারতের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বর্ষাকালে বাংলাদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-খাল দখল ও দূষণের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নদী-খাল দিয়ে প্রবাহিত হতে না পেরে নিচু ভূমি তলিয়ে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। বন্যা হলে শুধু জমির ফসল ও বাড়িঘরেরই ক্ষতি হয় না, গৃহপালিত পশুপাখি, হাঁস-মুরগি, বন্যপ্রাণী, গাছপালা ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের কাজকর্মের ওপর প্রভাব পড়ে। কর্মহীন হয়ে আর্থিক অভাব-অনটনে পড়ে যায়। এই মানুষগুলোকে না খেয়ে থাকতে হয়। এদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
বর্ষার সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। হাওর অঞ্চলে যেসব কৃষক ফসল হারিয়েছে তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন। বর্ষার সময়ে প্রয়োজন বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করা । বিকল্প কাজ হতে পারে, মাছ শিকারের জন্য জাল কিনে দেওয়া, ডিঙি নৌকার ব্যবস্থা করে দেওয়া, সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া যাতে হাঁস-মুরগি পালন করে পরিবার নিয়ে চলতে পারে।
আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। বন্যাকবলিত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য দুর্যোগপূর্ণ এলাকা আগেই চিহ্নিত করে পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করা। শুকনো খাবার চিঁড়া-মুড়ি-গুড় ও বোতলজাত পানি মজুদ করে রাখতে হবে। এই কাজগুলো করতে পারলে কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের কষ্ট ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আসা সম্ভব।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বন্যা, পাহাড়ধস, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি এই জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক মানুষগুলোর বাড়িঘর, কৃষিজমি, ফসল, ফসলের মাঠ, গবাদিপশু ইত্যাদি। আর এই মানুষগুলো আমাদের কৃষি অর্থনীতির প্রাণ। তাই বর্ষার প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জরুরি।
ড. কামরুজ্জামান : সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, ভাওয়ালগড়, সদর, গাজীপুর
মতামত লেখকের নিজস্ব





