fgh
ঢাকারবিবার , ৩ মে ২০২৬
  • অন্যান্য

বাংলাদেশে আছে চিতাবাঘ? বিশ্বে আশার আলো, কোথাও অন্ধকার

অনলাইন ডেস্ক
মে ৩, ২০২৬ ২:০৮ অপরাহ্ণ । ৩ জন

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী। একটি পূর্ণবয়স্ক, সুস্থ, স্বাস্থ্যবান পুরুষ চিতাবাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ভুল সময়ে ভুল জায়গায় এসেছিল সে। জাল দিয়ে ধরে পেটানো হলো, পানিতে চুবানো হলো। মারা গেল প্রাণীটি। গত ১৪ বছরে উত্তরাঞ্চলে এভাবেই মানুষের হাতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১০টি চিতাবাঘ।

আজ ৩ মে, আন্তর্জাতিক চিতাবাঘ দিবস। ২০২৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত প্রথম গ্লোবাল লেপার্ড কনফারেন্সের স্থায়ী উত্তরাধিকার হিসেবে এই দিনটি বিশ্ব বন্যপ্রাণী ক্যালেন্ডারে স্থায়ী জায়গা পেয়েছে। সেই কনফারেন্সে শত শত গবেষক, সংরক্ষণবিদ ও উৎসাহীরা একমত হয়েছিলেন, চিতাবাঘ নিয়ে সচেতনতা ও বিনিয়োগ এখনো যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই কথাটা আরও বেশি সত্য মনে হয়।

একসময় সারা দেশে ছিল যাদের বিচরণ
এককালে চিতাবাঘ ছিল বাংলাদেশের পরিচিত প্রাণী। আশির দশকেও ভাওয়াল ও মধুপুরের শালবনে, সিলেটের চা বাগানে, পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর অরণ্যে এদের নিয়মিত দেখা মিলত। গত শতকের মাঝামাঝিতে এমনকি উত্তরা ও মিরপুর এলাকায়ও দেখা যেত এই প্রাণীটিকে।

২০১৬ সালে আইইউসিএন চিতাবাঘকে বাংলাদেশের জন্য অতি বিপন্ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। আজ দেশে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৫০টি চিতাবাঘ টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়, তবে প্রকৃত সংখ্যা জানতে বৃহত্তর গবেষণার প্রয়োজন।

ক্যামেরার চোখে ধরা পড়া শেষ প্রমাণগুলো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের বন বিভাগ এবং ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স যৌথভাবে ২০০২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে চিতাবাঘের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছে। সেই গবেষণায় ২১টি চিতাবাঘের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬টি,

টেকনাফের বনাঞ্চলে ২টি, হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গায় ১টি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে উদ্ধার হয়েছে ৪টি এবং একই সময়কালে মানুষের হাতে পিটিয়ে মারা পড়েছে ৭টি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার হয়েছে চামড়া।

২০১৫ সালে সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে চিতাবাঘের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। গবেষণা শেষ হওয়ার পর ২০২১ সালের মার্চেও একটি চিতাবাঘ সাঙ্গুতে ক্যামেরায় ধরা পড়ে। রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুপ্রিয় চাকমার গবেষণা নিশ্চিত করেছে বান্দরবানের সাঙ্গু এবং রাঙামাটির কাসালং ও রাইংখং সংরক্ষিত অরণ্যে চিতাবাঘের উপস্থিতি।

কালো চিতাবাঘও দেখা গেছে এই দেশে

অনেকেই জানেন না, বাংলাদেশের বনে কালো চিতাবাঘও দেখা গেছে। শরীরে মেলানিনের আধিক্যে গায়ের রং কালো হয়ে যাওয়া এই চিতাবাঘগুলো ব্ল্যাক প্যান্থার নামে পরিচিত। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ খসরু চৌধুরী প্রায় তিন যুগ আগে বান্দরবানের আলীকদমে কালো চিতাবাঘ দেখেছিলেন। ১৯৯০ সালের দিকে রেমাক্রি এলাকায় একটি কালো চিতাবাঘ ফাঁদ পেতে মারার তথ্যও পাওয়া গেছে।

উত্তরের হতভাগ্য চিতাবাঘেরা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান গণমাধ্যমকে জানান, পার্বত্য অঞ্চল, সিলেটের সীমান্ত এলাকা, হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা ও মৌলভীবাজারের জুড়ির লাঠিটিলা বনে এখনো চিতাবাঘ আছে। তার মতে দেশে সর্বোচ্চ ৫০টির মতো চিতাবাঘ থাকতে পারে, তবে এটি কেবল ধারণা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ মনে করেন, উত্তরাঞ্চলে চিতাবাঘ শুধু ভুলে আসে না, পূর্বপুরুষের পুরোনো আস্তানায় টানেই আসে। তিস্তার উজানে ভারতীয় অংশের বনে প্রচুর চিতাবাঘ আছে, যেখান থেকে মাঝে মাঝে এরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিন্তু লোকালয়ে এলেই মানুষের পিটুনিতে মরতে হয়। গত ১৪ বছরে উত্তরাঞ্চলে এভাবে মারা গেছে অন্তত ১০টি চিতাবাঘ, অথচ কোনো হত্যার বিচার হয়নি।

বিশ্বে চিতাবাঘের অবস্থা

চিতাবাঘ বিশ্বের সবচেয়ে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বড় বিড়াল। রাশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত বিচরণ তার প্রমাণ। ভারতের মুম্বাইয়ের পাশে সঞ্জয় গান্ধী জাতীয় উদ্যানে এখনো প্রায় ১০০টি চিতাবাঘ আছে, যারা মাঝেমধ্যে শহরেও ঢুকে পড়ে। ভারতে মোট ১২ থেকে ১৪ হাজার চিতাবাঘ আছে বলে ধারণা।

কিন্তু পরিসংখ্যান ভালো নয় সব জায়গায়। আইইউসিএন পশ্চিম আফ্রিকার চিতাবাঘকে বিপন্ন ঘোষণা করেছে। গত দুই দশকে সেখানে সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমে মাত্র ৩৫০ জন পরিণত চিতাবাঘ অবশিষ্ট আছে। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের চিতাবাঘ এখন সেই দ্বীপের শেষ টিকে থাকা শীর্ষ শিকারি। জাম্বিয়ার কাফুয়ে জাতীয় উদ্যানে অবশ্য আশার আলো দেখা যাচ্ছে, উন্নত আইন প্রয়োগের কারণে সেখানে চিতাবাঘের ঘনত্ব দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

আমুর চিতাবাঘ পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল বড় বিড়াল, বন্যে যাদের সংখ্যা ১৫০-এর কম।

বাংলাদেশে গবেষণা নেই, সংরক্ষণও নেই

গবেষক মুনতাসির আকাশ গণমাধ্যমের কাছে একটি বেদনাদায়ক তথ্য তুলে ধরেছেন। চিতাবাঘ আছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে এই প্রাণী নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো গবেষণা বা সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে গত ১০ বছরে শত শত কোটি টাকা খরচ হয়েছে, ২৮টি আলাদা গবেষণা হয়েছে।

কিন্তু চিতাবাঘ নিয়ে প্রথম গবেষণাটিই হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে চিতাবাঘ হত্যার বিচারের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো হত্যার বিচার হয়নি।

এখনো সময় আছে
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনো যে এলাকাগুলোতে চিতাবাঘ আছে সেগুলো রক্ষা করা এবং সেখানে হরিণ, বানর, খরগোশের মতো শিকারের প্রাণী নিশ্চিত করা গেলে চিতাবাঘের সংখ্যা বাড়তে পারে। ভারত ও নেপালে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মানুষের সঙ্গে চিতাবাঘ সহাবস্থান করছে, বাংলাদেশেও তা সম্ভব। শুধু দরকার সচেতনতা, সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক চিতাবাঘ দিবসে বাংলাদেশের জন্য বার্তা একটাই। বাঘের পরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিড়ালজাতীয় প্রাণীটি এখনো টিকে আছে, কিন্তু আমরা যদি না জাগি তাহলে অনেক হারানো প্রাণীর মতো একদিন সে চিরতরে হারিয়ে যাবে বাংলাদেশের বন থেকে।বিডি প্রতিদিন/আশিক