সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৩
আগামী ১৩-১৪ মে অনুষ্ঠিতব্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। সমিতির তলবি সভার নামে রোববার মূলত বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়– এবারের নির্বাচনে ‘দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা’ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন না। তবে কেউ চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন।
সমিতির ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ এ সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ২০টি মনোনয়নপত্র জমা দেন। মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে যাচাই-বাছাই শেষে ওই ২০টি মনোনয়নপত্রের সবকটি বাতিল করে দেয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। বুধবার সমকালের খবর, শুধু বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সমর্থিতদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। অতএব দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের নির্বাচন সীমিত হয়ে পড়ল বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে।
অতীতে এ সমিতির নির্বাচনে দল দুটির সমর্থক আইনজীবীরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন।প্রসংগত, শক্তির বিচারে জাতীয় রাজনীতিতে যেমন, তেমনি আইন অঙ্গনেও বিএনপির শক্তির সঙ্গে জামায়াতের কোনো তুলনা চলে না। দেশে ইতোমধ্যে বেশ কিছু জেলা বার তথা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হয়েছে।
এর মধ্যে যেগুলোতে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা দলবদ্ধভাবে অংশ নিতে পেরেছেন, শুধু সেগুলোতেই জামায়াত দু-একটা পদ পেয়েছে; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিয়ে। যেমন গত ২ এপ্রিল কুমিল্লা জেলা বার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত এক প্যানেলে নির্বাচন করে ১৫টির মধ্যে ১৩টি পদে বিজয়ী হয়। জামায়াত সভাপতি পদে এবং বিএনপি সাধারণ সম্পাদক পদে জয়লাভ করে। তাদের বাধার মুখে আওয়ামীপন্থিরা এতে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে দুটো পদ পায়।
অন্যদিকে একই দিনে অনুষ্ঠিত বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১১ পদের পূর্ণ প্যানেলে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি, যেখানে আওয়ামীপন্থিরা স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতে পারেননি। জামায়াতের আইনজীবীরা আলাদা প্যানেল দিয়ে একটি আসনেও জেতেননি।
বুধবার থেকে চলমান ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে স্বতন্ত্রভাবেও দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। এতে বিএনপি-জামায়াত আলাদা প্যানেল দিয়েছে। সেখানে জামায়াত কেমন ফল করবে, তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট। বিশেষত গত ১৫ এপ্রিল ঢাকা বার ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের অন্যতম শীর্ষ নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির ‘আসন্ন আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে ষড়যন্ত্র, অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা নিয়ে’ কথা বলেছেন (দেশ রূপান্তর, ১৫ এপ্রিল)।
নির্বাচন কমিশন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গঠিত কমিটিতে ‘সমান ভাগ’ না দেওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। আসছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের পরিস্থিতিও কি অভিন্ন?
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি কিন্তু আর দশটা বারের মতো নয়। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ অন্য সব ছাত্র সংসদ থেকে আলাদা। ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিচারে তো বটেই, মর্যাদার প্রশ্নেও আইনজীবী সমিতিটি অনন্য। আশির দশকজুড়ে চলা সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে এ সমিতির ভূমিকা ছিল ডাকসুর মতোই অগ্রগণ্য।
১৯৮৩ সালে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল ডাকসুর নেতৃত্বে। ১৯৯০-এ সাফল্যের সঙ্গে শেষও হয় ডাকসুর নেতৃত্বে। মাঝখানে অবশ্য ডাকসু ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো ছিল নানা মঞ্চে বিভক্ত। এ কারণে আন্দোলন বহুবার চাঙ্গা হলেও অচিরেই থিতিয়ে পড়ত। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে গঠিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ এতে শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ, অ্যাডভোকেট শামসুল হক চৌধুরী, যারা পালাক্রমে এ সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন, সে সময় সর্বমহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা কত যে সভা করেছেন, হিসাব নেই। ছাত্র সংগঠনগুলোকে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন তারা।
প্রসঙ্গত, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর মূলত ক্ষমতাসীন সরকারের ছলচাতুরীর কারণে প্রায় দুই দশক ডাকসু নির্বাচন না হলেও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন বরারবই হয়েছে। উপরন্তু ক্ষমতাসীন সরকার পালাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে কোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক ইউনিয়ন,
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ইত্যাদি পেশাজীবী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি অনুসরণ করে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু অন্তত দেড় দশক আগে পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিকে কোনো সরকারই দখলে নিতে পারেনি। এ কারণেই নব্বই-পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এ সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু বিগত সরকারের আমলে বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংসের ফলস্বরূপ অনুষ্ঠিত একের পর এক একতরফা নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অঙ্গন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিও দখলের প্রক্রিয়া চলে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশেষত ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত এ সমিতির নির্বাচন রীতিমতো প্রহসনে পরিণত হয়।
দুর্ভাগ্যজনক, সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারও পূর্বসূরির দেখানো পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। তা না হলে অদ্ভুত সব যুক্তি দিয়ে, তোতা পাখির মতো বারবার একই বুলি আউড়ে প্রধান বিরোধী শক্তিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা কেন করবে?
অন্তর্বর্তী সরকার যে যুক্তি দিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে তা দেশে-বিদেশে প্রশ্ন তুলেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছাড়া রাষ্ট্র ও সমাজ অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না– তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। এমনকি রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও এমন পরিস্থিতিতে আশা করা যায় না। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং নির্বাচনের
জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। অথচ আইনজীবী সমিতির মতো পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হচ্ছে না।
বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আইনত নিষিদ্ধ। তাই তার সমর্থকরাও এসব নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
সমর্থকের কপালে কি দলীয় পরিচয় লেখা থাকে? সম্পূর্ণ পূর্বধারণা থেকে এই নির্বাচন পরিচলনাকারীরা কিছু প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাদের স্বতন্ত্র নির্বাচন করার সাংবিধানিক অধিকারও কেড়ে নিচ্ছেন। মূল ভয় যে পরাজিত হওয়ার– সেটা বোঝা যায় শরীয়তপুর, সিলেট, পিরোজপুর, ঠাকুরগাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বেশ কয়েকটি জেলা বার নির্বাচনে আওয়ামীপন্থিদের অংশগ্রহণ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে।
চলমান ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতি এবং অনুষ্ঠিতব্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের এই পরিস্থিতি দেখে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না– পেশাজীবী সংগঠনগুলোর পর একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষমতাসীনরা দখলে নেবে। আওয়ামী লীগকে ঠেকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে হয়তো জামায়াত-এনসিপিকে ভাগ দেওয়া হবে।
এতে সরকার হয়তো কিছুদিন মোটামুটি নির্বিঘ্নে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও আখেরে তা দেশকে আরেকটা বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলতে পারে। আর কিছু না হোক, এই নির্বাচনগুলোকে গণতান্ত্রিক বলার অবকাশ নেই।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল





