fgh
ঢাকারবিবার , ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

বাস্তুতন্ত্রের পুনর্গঠনই আনবে পরিবর্তন

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ২৬, ২০২৬ ১২:০৫ অপরাহ্ণ । ১ জন

আনুশেহ আনাদিল

 প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৪৮

এই ভূমিতে যুগে যুগে বহু স্রোত প্রবাহিত হয়েছে– আদিবাসী জনগণের প্রকৃতিবিদ্যা, লোকজ জ্ঞান ও জীবনের সহজ প্রজ্ঞা মিলিয়ে এই মাটিকে গভীরভাবে সজীব করেছে। নদী, বন, কৃষি, ঋতু ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে এই দেশ গড়ে উঠেছে এক জটিল কিন্তু প্রাণবান সভ্যতা হিসেবে। কিন্তু আজ সেই সম্পর্কের অনেকখানি ছিন্ন হয়েছে এবং সেই ছিন্নতার অভিঘাত আমরা অনুভব করছি সমাজ, পরিবেশ ও চিন্তার স্তরে।

বাংলাদেশ আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাহ্যিকভাবে উন্নয়নের গতি অব্যাহত থাকলেও ভেতরের সমন্বয় ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। নদী, মাটি, বন এবং মানুষের জীবন; যারা একসময় এক অবিচ্ছিন্ন জীবনের অংশ ছিল, তারা আজ পৃথক হিসেবে বন্দি।

এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়; বোধের সংকট।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা হলো চিন্তার বিকাশের তুলনায় মুখস্থ-নির্ভরতার প্রাধান্য। ফলে অনেক মানুষ তথ্য জানলেও গভীরভাবে বুঝতে শেখে না। প্রশ্ন করার ক্ষমতা দুর্বল হলে সমাজ সহজেই সরলীকৃত ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেই সরলীকরণ অনেক সময় মানুষকে বিভাজন, ভয়, এমনকি সহিংসতার দিকেও ঠেলে দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ভিন্ন বিশ্বাস ধারণের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, এমনকি প্রাণ পর্যন্ত হারিয়েছে। এ ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; একটি বৃহত্তর বৌদ্ধিক ও নৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন। কোনো ধর্মই তার মূল শিক্ষায় মানব হত্যা বা ঘৃণাকে সমর্থন করে না। যখন কোনো ব্যাখ্যা মানুষের প্রতি সহমর্মিতা হারায়

, তখন তা ধর্মের মূল সত্তা থেকে বিচ্যুত হয়। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে না শেখায়, তবে সে শুধু তথ্যভিত্তিক হলেও নৈতিকভাবে অস্পষ্ট এক নাগরিক হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিশু প্রশ্ন করবে; ভিন্ন মতকে বুঝতে ও মানবিকতার মূল সূত্র অনুধাবন করতে শিখবে। এই বৌদ্ধিক পুনর্গঠন একই সঙ্গে পরিবেশগত পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ। নদী, পলি, জলাভূমি ও বন মিলিয়ে গঠিত এক জীবন্ত ভূপ্রকৃতি। কিন্তু এই জীবন্ত ব্যবস্থাকে আমরা ক্রমেই যান্ত্রিক উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে সংকুচিত করছি। বর্তমানে দেশের বনভূমি ১৪-১৫ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩১ শতাংশ। পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি এবং ৩০-৩৫ শতাংশ সমন্বিত প্রাকৃতিক আচ্ছাদন প্রয়োজন।

এই ঘাটতি কেবল পরিবেশের নয়; এটি অস্তিত্বের ঘাটতি। বন কমে গেলে জলচক্র বিঘ্নিত হয়, বন্যা বাড়ে, তাপমাত্রা অস্থিতিশীল হয় এবং জীববৈচিত্র্য ভেঙে পড়ে। এটি কৃষি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরেও প্রভাব ফেলে।

অতএব, পুনরুদ্ধারের প্রশ্নটি কেবল বৃক্ষরোপণের নয়; এটি গোটা বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রশ্ন।

এই পুনর্গঠনের মধ্যে নদীকে আবার মুক্ত প্রবাহে ফিরিয়ে দিতে হবে; জলাভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং কৃষিকে আবার বৈচিত্র্যময় করতে হবে। একফসলি চাষ ব্যবস্থা মাটির স্বাভাবিক শক্তি কমিয়ে দেয় এবং কৃষককে বহিঃনির্ভরশীল করে তোলে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো– কৃষির ওপর বহিরাগত প্রভাব। আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত বীজ ও রাসায়নিক নির্ভর কৃষি মডেল অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পদ্ধতি প্রথমে উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে মাটির জৈবিক বৈচিত্র্য কমিয়ে দেয়; কৃষিকে নির্ভরশীল করে তোলে এবং স্থানীয় বীজের ঐতিহ্য ধ্বংস করে।
এ কারণে টেকসই নীতিগত অবস্থান থেকে স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতির পুনরুজ্জীবন এবং মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জাতীয় স্বাধীনতার ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ধারণা নয়। এটি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সক্ষমতার প্রশ্নও। বাংলাদেশকে অবশ্যই বৈশ্বিক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে থাকতে হবে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ যেন আত্মনির্ভরতার ভিত্তিকে দুর্বল না করে। স্থানীয় উৎপাদন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কৃষি ও কুটির শিল্পকে শক্তিশালী করা এ প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ।

জ্বালানি ক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য শক্তি– সূর্য, বায়ু ও স্থানীয় প্রযুক্তি অগ্রাধিকার পেতে পারে, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে নির্ভরশীলতা কমে। এসব কিছুর কেন্দ্রে একটি মৌলিক সত্য রয়েছে– প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে নিজেকে রক্ষা করা। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ মানুষকে বিনয় শেখায়। সে বুঝতে পারে, সে একা নয়; বৃহত্তর এক জীবন্ত ব্যবস্থার অংশ। এ উপলব্ধি থেকেই গড়ে উঠতে পারে এমন এক নাগরিক

সমাজ, যা কেবল স্থানীয় নয়, বৈশ্বিকভাবেও সচেতন।

আমি জানি, এ কথাগুলো হয়তো অনেকের কাছে খুবই সরল বা স্বপ্নের মতো শোনাতে পারে। আমি হয়তো বিশ্ব রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জটিল বাস্তবতা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছি। তবু  বিশ্বাস করি, যদি আমরা প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে নতুন করে না ভাবি, তাহলে এই পৃথিবী শুধু একটি দেশের নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই ভারসাম্য হারাবে।

বাংলাদেশ তার উর্বর মাটি, প্রাচীন জ্ঞান ও বহুমাত্রিক আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির কারণে এমন এক জায়গা হতে পারত, যেখানে এই বোধ সবচেয়ে গভীরভাবে জন্ম নেয়। তাই আমি এ দেশের মানুষের কাছে বেশি সচেতনতা, বেশি প্রজ্ঞা প্রত্যাশা করি।

বাংলাদেশ তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ সম্ভাবনার দেশ। এটি বহু স্রোতের মিলনভূমি, যেখানে বিভিন্ন চিন্তা, ধর্ম, দর্শন ও জীবনধারা একসঙ্গে প্রবাহিত। এই বহুত্বই এর শক্তি। এ কারণেই এ দেশের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক সূচকে নির্ধারিত হতে পারে না। এটি নির্ধারিত হবে চিন্তার গভীরতা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানবিকতার স্থায়িত্বের মাধ্যমে। এই রূপান্তর সহজ নয়। এটি ধীর, জটিল এবং বহুস্তরীয়। তবু এটি অপরিহার্য।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী, সমাজকর্মী