fgh
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

কৃষকের হাতে কার্ড, মিলবে ১০ সুবিধা

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ১৬, ২০২৬ ১:৩৩ অপরাহ্ণ । ৩ জন

 জাহিদুর রহমান ও আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল থেকে

 প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:২৭

পহেলা বৈশাখের দুপুর। রঙিন শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে চারদিকে উৎসবের আবহ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতিবিজড়িত টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামজুড়ে মানুষের ঢল। তারা মাঠের মানুষ, যাদের হাতের মাটির গন্ধে টিকে আছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। সেই কিষান-কিষানির হাতে তুলে দেওয়া হলো প্রতীক্ষিত ‘কৃষক কার্ড’।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ল্যাপটপের একটি বাটন চাপতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। মুহূর্তের মধ্যে টাঙ্গাইলসহ দেশের ১১ উপজেলার ২২ হাজার ৬৫ প্রান্তিক কৃষকের মোবাইল ফোনে পৌঁছে গেল আড়াই হাজার টাকা (বার্ষিক) আর্থিক সহায়তা। একই সঙ্গে উদ্বোধন হলো কৃষক কার্ড, যা কৃষকের জন্য সমন্বিত সহায়তার ভিত্তি।

এর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে আরেক ধাপ এগোল বিএনপি সরকার। এর আগে ফ্যামিলি কার্ড, ক্রীড়া কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল।

বাংলা নববর্ষের দিনে এমন কর্মসূচির প্রতীকী দিক আছে। বছরের শুরুতে নতুন খাতা খোলার মতো কৃষকের জন্যও যেন নতুন হিসাবের সূচনা। সরকারপ্রধান মঞ্চে একে একে টাঙ্গাইলের ১৫  কিষান-কিষানির হাতে কৃষক কার্ড ও গাছের চারা তুলে দেন। তারা হলেন– আবু কায়সার, রোমান, শাহনুর আলম, শাহ আলম, জুলেখা আখতার, নাসিমা খানম সুমনা, শিল্পী, আমেনা বেগম, নবাব আলী, মোহাম্মদ আলী, কবির হোসেন, মনোয়ারা আখতার, শামীমা আখতার, লায়লা বেগম ও তাহমিনা।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে–এই ধারণা থেকেই এই কর্মসূচির সূচনা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরকার পর্যায়ক্রমে দুই কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের হাতে কার্ড পৌঁছে দেবে বলে জানান তিনি। পাঁচ কিষান-কিষানির হাতে কৃষক কার্ড ও গাছের চারা তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘এই যে গাছের চারা দিচ্ছি, তা বড় হলে ফল কিন্তু আমার জন্য পাঠাবেন।

কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের যেসব অঞ্চল কৃষি নির্ভরশীল এলাকা, সেখানে আমরা কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব, কিষানি বোনদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।

অনুষ্ঠানে দুই কিষান-কিষানি ‘কৃষি কার্ড’ নিয়ে তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কৃষক কবির হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকে কৃষিকাজ করেছি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি নতুন। এখন আর কারও কাছে ঘুরতে হবে না। ঋণ, বীজ, সারসহ সবকিছু সহজে পাব।

কিষানি তাহমিনা আখতার বলেন, জমি থাকলেও আগে বীজ-সারের অভাবে চাষ করতে পারতাম না। এখন কার্ড হাতে পেয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী, নিজের জমিতে উৎপাদন বাড়াতে পারব।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, এফএওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি জাইয়োকান শি ও কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ।

কৃষক কার্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে টাঙ্গাইলে শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে আয়োজিত কৃষি মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বিকেল ৫টায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত করেন এবং টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

এ সময় তারেক রহমান বলেন, জুলাই সনদে বিএনপি সই করেছে এবং এর প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন বাস্তবায়ন করা হবে। যারা বিএনপির খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, পেশাদার খেলোয়াড় তৈরিসহ এসব জনকল্যাণ কর্মসূচিকে  বাধাগ্রস্ত করতে চাইবে, বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করবে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে; আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। স্বৈরাচারের ভূত কাদের ওপর আবার আছর করছে? কারা আবার দেশে অরাজকতা তৈরি করতে চাচ্ছে?’

কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যা পাবেন কৃষক
‘কৃষক কার্ড’ শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি ডেবিট কার্ড, যার মাধ্যমে কৃষকের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। সেখান থেকেই মিলবে নগদ সহায়তা, আবার একই কার্ড ব্যবহার করে পাওয়া যাবে কৃষি উপকরণ, ঋণ, ভর্তুকিসহ নানা সুবিধা।

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে আছে– ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষিযন্ত্র প্রাপ্তি, সরকারি প্রণোদনা, আবহাওয়ার তথ্য, প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনে পরামর্শ, কৃষি বীমা এবং ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ।

তবে নগদ আর্থিক সুবিধা পাবেন মূলত ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কার্ড একটি ডাটেবেজ তৈরি করবে। কে প্রকৃত কৃষক, কোথায় কী চাষ হয়, কার কী প্রয়োজন– এসব তথ্য এক জায়গায় আসবে। আপাতত ১১ উপজেলায় প্রাক-পাইলটিং চলছে। এতে ব্যয় হচ্ছে আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চার বছরের মধ্যে সারাদেশে এই কার্ড বিতরণ ও পূর্ণাঙ্গ ডাটেবেজ তৈরি করা।

কৃষক কার্ড পাওয়া কবির হোসেনকে ঘিরে বিভ্রান্তি
টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধনী মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে কার্ড নিয়েছিলেন কবির হোসেন। কৃষক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার সেই মুহূর্তটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে কবির হোসেনকে বিত্তশালী, ভিন্ন জীবনযাপনের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দাবি ওঠে, তিনি প্রকৃত কৃষক নন; বরং তাকে কৃষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে ঘটনার পর কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর টাঙ্গাইলে গিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান করেন। তাদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, কবির হোসেন কৃষিকাজের সঙ্গেই যুক্ত। পরে জানা যায়, বিভ্রান্তির মূল উৎস ছিল সামাজিক মাধ্যমে তাঁর নিজের শেয়ার করা কিছু ছবি। ২০২৫ সালে নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন লোকেশনের ছবি পোস্ট করেছিলেন কবির হোসেন। সেই ছবিগুলো নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়।

‘দ্য ডিসেন্ট’-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি ছবি গুগলের জেমিনি এআই ব্যবহার করে তৈরি। বাস্তবের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক নেই। এদিকে কবির হোসেন নিজেও স্বীকার করেছেন, এআই ব্যবহার করে তাজমহল, মক্কা কিংবা সমুদ্র ভ্রমণের মতো ছবি তৈরি করেছিলেন তিনি, যা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়।