আহমেদ স্বপন মাহমুদ
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১২
কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। সংঘবদ্ধভাবে একজন পীরের দরবারে হামলা, লুটপাট ও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার উদ্বেগজনক ঘটনা কেবল নয়, সেখানে সুফি সাধক জাহাঙ্গীর শামীমকে নিজ দরবারে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বিভিন্ন লক্ষণে এটা স্পষ্টতই পূর্বপরিকল্পিত।
কুষ্টিয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন বা নতুনও নয়। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ‘মব সন্ত্রাস’ নামে এ ধরনের ঘটনা ক্রমেই যেন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে। এর একটি নামও ক্রমে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে– মব সন্ত্রাস। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটি তুঙ্গে উঠেছিল বলে অনেকে ওই শাসনামলকে ‘মবতন্ত্র’ আখ্যাও দেন। এই অভিধা শুধু রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, যেখানে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সংঘবদ্ধ জনতার নামে সংগঠিত সহিংসতা নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছিল।
পরিসংখ্যানই বলে দেয় পরিস্থিতির ভয়াবহতা। ২০২৫ সালেই মবের হাতে নিহত হয়েছেন ১৯৭ জন মানুষ। এটি কেবল সংখ্যা নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি আস্থার ভাঙনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে প্রকাশ্যে; অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীরব উপস্থিতিতেই।
মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ ছিল ধর্মীয় উন্মাদনা ও গুজবকে কেন্দ্র করে সহিংসতা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত মাজার ভাঙচুর হয়েছে। বাংলার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির ধারক-বাহক বাউল সাধকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। শুধু তাই নয়; ভাস্কর্য ভাঙচুর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, এমনকি বইমেলা বা নাট্য আয়োজনেও বাধা দেওয়া হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।
এসব ঘটনার একটি বড় অংশ সংঘটিত হয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সহিংস জনতাকে সংগঠিত করার এই প্রবণতা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বস্তুত, সমাজের একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী ধর্মের অজুহাতে এ দেশের বহুত্ববাদী সামাজিক, সাংস্কৃতিক চর্চা ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে চায়। সমাজকে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। বহুত্ববাদী উদার গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বহু মত ও পথের চর্চা বন্ধ করতে চায়।
আরও উদ্বেগজনক, মব সন্ত্রাস কেবল স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল নীরব বা সক্রিয় রাজনৈতিক মদদ। একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই সহিংসতাকে ব্যবহার করেছে নিজেদের মতাদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে। সরকারের ভেতরে-বাইরে থেকেও এমন কিছু বক্তব্য শোনা গেছে, যারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই মব সহিংসতার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা কী ছিল? তারা কি এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, নাকি কোনো ধরনের সমঝোতা বা নীরব সমর্থন ছিল? এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর আজও মেলেনি। বাস্তবতা হলো, মব সন্ত্রাসের কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তারা ‘মবতন্ত্র’ থেকে মুক্তি চেয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের আগমন ছিল আশার জায়গা। জনগণ মনে করেছিল, এবার হয়তো মব-অরাজকতার অবসান হবে। রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক ভূমিকা ফিরে পাবে; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মবের ইতি টানবেন– বলেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ও জনপ্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক খুব দ্রুতই চোখে পড়ছে। সরকারের নাকের ডগায়, গত দুই দিনেই শাহবাগ ও কুষ্টিয়ায় যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই আশাব্যঞ্জক নয়। বরং আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।
কুষ্টিয়ার ঘটনা স্পষ্টতই রাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ; দেশের আইনের প্রতি, প্রশাসনের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে, নাকি বিগত মবতন্ত্রের মতো নীরব থাকবে?
এখন সময় এসেছে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মবতন্ত্র কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সমাজের অংশ নয়; এটি গণতন্ত্রের বিপরীত শক্তি। ধর্মের নামে, সংস্কৃতির নামে কিংবা ন্যায়বিচারের নামে যে কোনো ধরনের মব সন্ত্রাসকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং সামাজিক সচেতনতা।
ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী সরকার যদি সত্যিই জনগণের আস্থা ধরে রাখতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হতে হবে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যারা এই সহিংসতাকে নৈতিক বা রাজনৈতিক সমর্থন দেয়, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী সমাজ। এখানে সুফি, বাউল, সাধক, শিল্পী– সবাই এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বহুত্ববাদ রক্ষা করা শুধু সাংস্কৃতিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। উগ্রবাদী মব সহিংসতা থেকে দেশ ও জনগণ যদি পরিত্রাণ না পায় তাহলে গণতন্ত্রের আলো কখনোই পূর্ণভাবে বিকশিত হবে না।
আহমেদ স্বপন মাহমুদ: কবি ও প্রাবন্ধিক





