fgh
ঢাকারবিবার , ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

পানিসম্পদ খাতে নতুন সরকারের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬ ১২:২১ অপরাহ্ণ । ৪৩ জন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দেশের দায়িত্ব নিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারেই ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল পুনর্খননের ঘোষণা দিয়েছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছি সর্বশেষ নিবন্ধে (ইশতেহারে নদী: নিয়ত ভালো, তরিকায় ভ্রান্তি; সমকাল, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।

লক্ষণীয়, ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার এক দিন পরই ১৯ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমকালের প্রতিবেদন বলছে– ‘বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং জাতীয় পর্যায়ে নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন কর্মকৌশল নির্ধারণ ও নির্দেশিকা প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রী আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় বসেন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, অর্থ ও পরিকল্পনা; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; ভূমি, কৃষি, পানি মন্ত্রণালয়সহ ১২ মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন’ (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।

দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নির্বাচনের আগে বিএনপির বিশেষ মনোযোগ এবং বিজয়ের পর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী অ্যানী নদীমাতৃক বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে কতটা সদিচ্ছা ও সক্রিয়তার পরিচয় দিতে পারেন, সেটা দেখার জন্য অবশ্য মধুচন্দ্রিমাকাল পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অবশ্য এখনই তাঁকে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে, সেটা হচ্ছে সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পানিসম্পদ উপদেষ্টার গত দেড় বছরের চিন্তা ও তৎপরতার সঙ্গে তুলনার চাপ।

এটা ঠিক, রহস্যজনক কারণে গত চার দশকে এই মন্ত্রণালয় যে সরকারের অগ্রাধিকারে থাকেনি– সেটা ২০২৪ সাল পর্যন্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর তালিকা দেখলেই বোঝা যায়। সেই প্রেক্ষাপটে প্রায় তিন দশক ধরে দেশের পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পাওয়ায় পরিবেশকর্মীদের মধ্যে বিপুল আশাবাদ জন্মেছিল। বস্তুত, গত দেড় বছরে এই খাতের অভিমুখ ও অগ্রাধিকার নিয়ে নিজে শুধু সমকালেই যত নিবন্ধ লিখেছি, সেটা ‘রেকর্ড’ হতে পারে। যেমন, নদী সুরক্ষায় নতুন সরকারের পাঁচ করণীয় (সমকাল, ১৯ আগস্ট ২০২৪); গোড়া কাটা নদীর আগায় বন্যার পানি (২৬ আগস্ট ২০২৪); তিস্তা নিয়ে ‘নরম-গরম’ কথার বাইরেও যা করতে হবে (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪); ইলিশ রপ্তানি বিতর্কের বাকি ইতিহাস (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪); ২০২৫ সালে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে ৫ চ্যালেঞ্জ (১ জানুয়ারি ২০২৫); তিস্তা নিয়ে বিএনপি আরও যা করতে পারে (২ মার্চ ২০২৫); জাতিসংঘ পানি সনদ: নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারিক প্রশ্ন (৪ মে ২০২৫); ফেনীর বন্যা: এক বছর সরকার কী করেছে (১৩ জুলাই ২০২৫); নদী সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার কত নম্বর পেতে পারে (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫); গদাধরের গন্ডার কিংবা দুধকুমারের দুঃখ (১২ অক্টোবর ২০২৫); নির্বাচনের আগেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু সম্ভব? (২৬ অক্টোবর ২০২৫); গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছর (১ জানুয়ারি ২০২৬); গঙ্গা ব্যারাজের ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি (২৫ জানুয়ারি ২০২৬)।

প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু আমি বা রিভারাইন পিপলের সহযোদ্ধাদের নয়; পানিসম্পদ খাত নিয়ে দেশের অন্যান্য পরিবেশকর্মীর প্রত্যাশা পূরণেও অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল হয়েছিল? সেটা পরিমাপে ওই সরকারের এক বছর পূর্তিতে ‘নদী সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার কত নম্বর পেতে পারে’ শীর্ষক নিবন্ধে ২০টি সূচক সামনে রেখেছিলাম– ১. নদী কমিশন সংস্কার; ২. নদ-নদীর তথ্যভান্ডার তৈরি; ৩. প্রকল্প পর্যালোচনা ও ব্যয় সাশ্রয়; ৪. দখল-দূষণ রোধে শূন্য সহিষ্ণুতা; ৫. নির্বিচার বালু উত্তোলন বন্ধ; ৬. মৎস্যসম্পদ সুরক্ষা; ৭. নদীভাঙন রোধ; ৮. খাল উদ্ধার; ৯. প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ; ১০. কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ; ১১. গঙ্গার চুক্তি নবায়ন; ১২. তিস্তার পানি বণ্টন বা ব্যবস্থাপনা; ১৩. ব্রহ্মপুত্রে চীন-ভারতের মেগা ড্যাম; ১৪. আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ স্বাক্ষর; ১৫. ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প; ১৬. বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকল; ১৭. যৌথ নদী কমিশন সংস্কার; ১৮. বন্যা পূর্বাভাসের সঙ্গে বাঁধ ব্যবস্থাপনার তথ্য; ১৯. নদীর বদলে অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি; ২০. দ্বিপক্ষের বদলে বহুপক্ষীয় কমিশন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত নিবন্ধে রয়েছে; এখন এতটুকু বলা যেতে পারে, চ্যালেঞ্জগুলো অভিন্নই রয়ে গেছে। এমনকি নতুন সরকারেরও বর্ষপূর্তিতে এই সূচক ধরে সাফল্য-ব্যর্থতা পরিমাপ সম্ভব।

স্বীকার্য, বাংলাদেশের মতো দেশে ‘পাবলিক ডিউটি’ পালন করতে গিয়ে সবার প্রত্যাশা পূরণ দূরে থাকুক, সামাল দেওয়া কঠিন। পানিসম্পদের মতো ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে জটিল এবং অর্থ ও সময়ঘনিষ্ঠ খাতে দশকের পর দশক ধরে জমা প্রত্যাশা মাত্র দেড় বছরে পূরণ করতে চাওয়াও বাতুলতার নামান্তর বটে। এর ওপর থাকে তদবিরবাজি ও সিন্ডিকেটবাজির চাপ। এমনকি তেলবাজরাও কম সমস্যা নয়। ক্ষমতায় থাকাকালে এরা মাছির মতো ভনভন করে এবং ক্ষমতা চলে গেলে মৌমাছির হুল ফোটাতে থাকে।

ব্যবহারিক কিছু দ্বিমত সত্ত্বেও এটা স্পষ্ট, অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নীতি ও কাঠামোগত দিক থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করে গেছে। যেমন হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬; ড্রেজিং ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৪; শিল্প খাতে পানি ব্যবহার নীতিমালা চূড়ান্তকরণ; জাতিসংঘ পানি সনদে পক্ষভুক্তি; বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন পুনর্গঠন; মার্কিন আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি; চীনা পানিসম্পদ কমিশনের সঙ্গে যৌথ কর্মদল গঠন ইত্যাদি।

এ ছাড়া কর্মসূচি ও কার্যক্রম সংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপও নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে– নদী ও খালের তালিকা; এক দশকের বেশি অলস বসে থাকা পানি আইনের প্রয়োগ শুরু; ঢাকা ঘিরে থাকা চারটি নদী এবং বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে অন্তত একটি নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ; বিল ও খাল রক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য আগে থেকেই ঝুলে রয়েছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চাপ। এ বছর যোগ হবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের ইস্যুও। পূর্বসূরির সঙ্গে তুলনা ছাড়াও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রীকে এসব প্রত্যাশা ও পরীক্ষার চাপও সামাল দিতে হবে।

বাইরের সেবাপ্রত্যাশী ও নাগরিক সমাজের চাওয়া-পাওয়া এবং পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল পুনর্খননের পাশাপাশি নতুন সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘নিজস্ব’ চ্যালেঞ্জ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সূচিত কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া। ওই সরকারের নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারগুলোর ওপর অন্তত ‘দাঁড়িয়ে থাকা’।

মনে আছে, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময় ছিলেন নির্বাচন কমিশনার। ২০১২ সালে তিনি কমিশন থেকে অবসর গ্রহণের পর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। বলেছিলেন, এটিএম শামসুল হুদা কমিশনে যে নীতিগত কাঠামো তৈরি করেছে, সেখানে ‘দাঁড়িয়ে থাকতে’ পারলেই চলবে। বলা বাহুল্য, পরবর্তী তিনটি নির্বাচন কমিশনই হুদা কমিশনের রেখে যাওয়া কাঠামোতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। আর দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এর প্রভাব সর্বনাশা ও সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছিল।
সংক্ষেপে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রীর জন্য একই সতর্কতা প্রযোজ্য। গত দেড় বছরের নীতি ও কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না; বরং দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে অবারিত সুযোগ।