হামিদুর রহমানের নাম সরকারি নথিতে এবং মানুষের মুখে প্রতিষ্ঠিত হলেও, নভেরা আহমেদ হারিয়ে গেলেন এক অদ্ভুত বিস্মৃতির অন্ধকারে। আনিসুজ্জামান পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, শহীদ মিনারের নকশায় নভেরা আহমেদের অবদান ছিল হামিদুর রহমানের সমান। কিন্তু তৎকালীন নথিপত্রে তাকে কেবল ‘সহযোগী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্তঝরা দুপুরের ঠিক দুদিন পর, ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা কাঁচা ইটে যে প্রথম শহীদ মিনারটি গড়েছিলেন, সেটি ছিল এক তাৎক্ষণিক দ্রোহ। কিন্তু সেই মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়ার পর বাঙালির মনে যে স্থায়ী স্থাপত্যের বীজ বপন হয়েছিল, তার পূর্ণতা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত। তৎকালীন শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এমন এক স্মারক তৈরি করতে হবে যা কেবল শোকের নয়, বরং বাঙালির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রতীক হবে। এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন বিলেত ফেরত দুই তরুণ তুর্কি—শিল্পী হামিদুর রহমান ও ভাস্কর নভেরা আহমেদ।হামিদুর রহমান ছিলেন মূলত চিত্রশিল্পী। কিন্তু তার চিন্তায় ছিল এক বিশাল স্থাপত্যিক ক্যানভাস। আর তার এই ভাবনার ভেতরে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন নভেরা আহমেদ, যিনি তখন ইউরোপের আধুনিক ভাস্কর্য ঘরানাকে বাংলার মাটিতে রোপণ করতে চাইছিলেন। তবে নভেরার এ চাওয়ার পথে খানিকটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজবাস্তবতা। বদরুদ্দীন উমরের ঐতিহাসিক ভাষ্য থেকে জানা যায়, শহীদ মিনারের নকশা করার সময় এই দুজনকে প্রচণ্ড বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। রক্ষণশীল সমাজ ও আমলারা প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন একটি স্তম্ভ সোজা না হয়ে সামান্য বাঁকানো হবে? কেনই বা সেখানে ম্যুরাল বা ছবির ব্যবহার থাকবে?
হামিদুর ও নভেরা তাদের নকশায় এক আপাত অদ্ভুত দর্শন উপস্থাপন করেছিলেন। মাঝখানের উঁচু স্তম্ভটি সামান্য ঝুঁকে থাকা অবস্থায় একজন মমতাময়ী ‘মা’-কে নির্দেশ করে, আর দুই পাশের চারটি ছোট স্তম্ভ সেই মায়ের চার সন্তান—সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার। এই যে মা ও সন্তানের চিরন্তন সম্পর্ককে কংক্রিটের উল্লম্ব রেখায় ফুটিয়ে তোলা, এটি ছিল নভেরা আহমেদের মূর্ত ও বিমূর্ত ভাস্কর্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। নভেরা কেবল ড্রয়িংরুমে বসে নকশা করেননি; ১৯৫৭-র তপ্ত রোদে ঢাকা মেডিকেলের সামনে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি মিস্ত্রিদের সঙ্গে সিমেন্ট আর কাদা মেখে কাজ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে পাওয়া যায়, প্যান্ট-শার্ট পরা এক তরুণী ভাস্কর যখন কোদাল হাতে মিনারের নিচের অংশে কাজ করতেন, তখন কৌতুহলী ও অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রুপকারী মানুষের ভিড় জমে যেত। কিন্তু তাতে নভেরার কী আসে যায়?
‘নভেরা আহমেদ: আ ট্রিলজি’ এবং ‘সাউথ এশিয়ান আর্ট জার্নাল’ এর তথ্য অনুযায়ী, শহীদ মিনারের মূল নকশাটি ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত। সেখানে ১৫০০ বর্গফুটের একটি ম্যুরাল তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন হামিদুর রহমান। মাটির নিচের গ্যালারিতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলার কথা ছিল সে নকশায়। কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে যখন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে, ঠিক তখনই আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন। কাজ বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ আসে। পাকিস্তানি শাসকরা এই মিনারকে ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি’র অংশ বলে মনে করত। বর্তমানের শহীদ মিনারে আমরা সেই ম্যুরাল বা ঝকঝকে রঙিন কাঁচের কাজগুলো দেখি না, যা ছিল মূল নকশার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই কাঁচের টুকরোগুলো এমনভাবে বসানোর কথা ছিল যাতে সকালের সূর্য পড়লে মিনারের মেঝেতে রক্তের আভা খেলে যায়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যখন দ্রুততম সময়ে শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণ করা হয়, তখন হামিদুর রহমানের মূল নকশাকে অনেক ক্ষেত্রেই সংক্ষিপ্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটেছিল ইতিহাসের পাতায়। হামিদুর রহমানের নাম সরকারি নথিতে এবং মানুষের মুখে প্রতিষ্ঠিত হলেও, নভেরা আহমেদ হারিয়ে গেলেন এক অদ্ভুত বিস্মৃতির অন্ধকারে। আনিসুজ্জামান পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, শহীদ মিনারের নকশায় নভেরা আহমেদের অবদান ছিল হামিদুর রহমানের সমান। কিন্তু তৎকালীন নথিপত্রে তাকে কেবল ‘সহযোগী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। অভিমানী নভেরা ১৯৬০-এর দশকেই দেশ ছাড়েন। ১৯৭২ সালে পুনর্নির্মাণের সময় তাকে ডাকার বা তার খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আনা ইসলাম বা শামীম আমিনের মতো গবেষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় নভেরা আহমেদের এই বিস্মৃত অবদান আবার সামনে আসতে শুরু করেছে। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক প্যারিস ও ইউরোপীয় ভাস্কর্যের যে ফর্ম আমরা শহীদ মিনারে দেখি, তার কারিগর ছিলেন নভেরা। মুর্তজা বশীর একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, শহীদ মিনার যদি একটি কবিতা হয়, তবে তার ছন্দের অনেকটা অংশই এসেছিল নভেরার ভাস্কর্যবোধ থেকে। নভেরা আহমেদ প্যারিসের এক নিভৃত স্টুডিওতে জীবন পার করে দিয়েছেন। কিন্তু নিজের সৃষ্টির স্বীকৃতি বাংলাদেশে জীবদ্দশায় সেভাবে পাননি।
ইতিহাসের এই নির্মম বিস্মৃতি নিয়ে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘হৃৎকলমের টানে’ গ্রন্থে এক ক্ষুব্ধ ও সত্যনিষ্ঠ আক্ষেপ ঝরিয়েছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। তিনি লিখেছিলেন,
‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দু’জন তাদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমতঃ আমরা আমরা অনেকেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন, যদিও বা জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম; খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদের সঙ্গে আরো এক জন ছিলেন। হামিদের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দু’জনে এক সঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন; অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ—আমাদের ভাস্করদের ভেতরে কাল, সাহস এবং প্রতিভার প্রেক্ষিতে যিনি প্রথম।‘
সৈয়দ হক কেবল তথ্যের অভাবকে দায়ী করেননি, বরং আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক সংকীর্ণতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন,
নভেরা এখন কোথায় আছেন জানি না, অনেকদিন থেকে তিনি দেশে নেই। আর তিনি যখন দেশে নেই তখন তো আমাদের ঐতিহ্য অনুসারে তাকে মনে রাখবার দায়ও আমাদের নেই। অতএব আমরা নভেরাকে বেমালুম ভুলে গেছি।… প্রশ্নকারী যে প্রশ্ন করবেন তাকে তো আগে জানতে হবে নভেরা আহমদ নামে একজন ভাস্করের অস্তিত্বের কথা!’
লেখকের এই পর্যবেক্ষণ আজও আমাদের জন্য এক বড় সত্য। হামিদুর রহমান তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বা প্রামাণ্যচিত্রে কেন নভেরার নাম উল্লেখ করেননি, সেই প্রশ্নটিও সৈয়দ হক তুলেছিলেন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের স্বীকৃতি কেবল যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে না, অনেক সময় তা নির্ভর করে নথিপত্র সংরক্ষণ এবং উত্তরসূরিদের সচেতনতার ওপর।
আজ যখন আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, তখন আমরা কেবল ইটের কাঠামো দেখি না, দেখি দুই শিল্পীর সেই লড়াই। একদিকে হামিদুরের রঙের স্বপ্ন, অন্যদিকে নভেরার পাথুরে দৃঢ়তা। শহীদ মিনার তাই কেবল একটি স্তম্ভ নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক অসমাপ্ত বিপ্লব। যার প্রতিটি ইঞ্চিতে লুকিয়ে আছে এক নারীর নিরব বিসর্জন আর এক চিত্রশিল্পীর মহৎ স্বপ্ন। ৫২-র রক্ত যেমন আমাদের ভাষা দিয়েছে, তেমনি হামিদুর-নভেরা জুটি আমাদের দিয়েছে সেই ভাষাকে কংক্রিটে অমর করে রাখার এক চিরন্তন শক্তি।





