ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য

সাগরিকার মা–বাবা আজ আনন্দে আরও কাঁদবেন

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৪ ১:৫৯ অপরাহ্ণ । ৩২ জন

সেই মেয়ের নাম মোসাম্মাৎ সাগরিকা। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব–১৯ নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল থেকে ট্রেনে করে ঢাকায় আসাটা সহজ কিছু নয়, অনেক লম্বা পথ। বসার জায়গা না পেলে এই যাত্রা আরও দীর্ঘ হয়ে যায়। তার ওপর আনজু বেগম একটু অসুস্থও। এক সহযাত্রীকে অনুরোধ করে চালের বস্তার ওপর একটু বসার সুযোগ পেয়েছিলেন বলে রক্ষা।

আজ সাগরিকার বাবা লিটন আলী সেই কথা মনে করছিলেন আর তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছিল, ‘আমি আমার মেয়েকে খেলতে দিতে চাইনি। আমরা যে পরিবার, তাতে ফুটবল খেলা একটা বিলাসিতাই মনে হয়েছিল। তা ছাড়া আমার একটা শঙ্কা ছিল, ফুটবল খেললে সবাই কী বলবে! মেয়ের তো বিয়ে দিতে হবে! কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি পুরোপুরি ভুল ছিলাম। মেয়ে এখন শুধু আমাদের নয়, পুরো দেশের। আমার মেয়ে দেশের হয়ে খেলছে—এই গর্ব আমি কোথায় রাখি!’

আনজু বেগমও অশ্রুসিক্ত নয়নে সাগরিকার ফুটবলার হয়ে ওঠার সময়টার কথা বললেন, ‘আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করেছে। আমাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ওকে খেলতে হয়েছে। তবে ও ফুটবলার হওয়ার জন্য জেদ ধরেছিল। ওকে কিছুই দিতে পারিনি, সে আমাদের কাছে একটা বুট চেয়েছিল, আমরা দিতে পারিনি। বুটের অনেক দাম। সেই টাকা খরচের সামর্থ্য আমাদের ছিল না।’

আজ ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল। শেষ বাঁশি বাজার পর সাগরিকার মুখে এমন হাসিটাই দেখতে চান সমর্থকেরাপ্রথম আলো

ছোটবেলা থেকেই রানীশংকৈলের রাঙাটুঙ্গি একাডেমিতে বেড়ে উঠেছেন সাগরিকা। সেই একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক তাজুল ইসলামের হাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সেই রাঙাটুঙ্গি একাডেমি থেকে কয়েকজন মেয়েকে ভর্তি নিতে চেয়েছিল বিকেএসপি। কিন্তু সাগরিকা সেখানে গিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। তাজুল ইসলামই সাগরিকার বিকেএসপিতে ভর্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রী থাকতে না চাওয়ায় তাঁকে ফেরত নিয়ে আসেন। এরপর সেই রাঙাটুঙ্গি থেকেই সাগরিকাকে অন্য নারী ফুটবলারদের সঙ্গে দলে ভেড়ায় মেয়েদের ফুটবল লিগের দল এফসি ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

মেয়েদের লিগে সাগরিকা পাল্লা দিয়েছেন দেশের শীর্ষ নারী ফুটবলারদের সঙ্গে। সেবার ২৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন আকলিমা আক্তার। সাগরিকা গোল করেছিলেন ১০টি। এরপরই মেয়েদের ফুটবলের সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন তাঁকে নিয়ে আসেন মেয়েদের বয়সভিত্তিক দলে।

সাফ অনূর্ধ্ব–১৯ ফুটবলে মেয়ের খেলা দেখতে পারেননি সাগরিকার মা–বাবা। বাড়িতে তাঁদের টেলিভিশনই যে নেই। তবে কথা হয়েছে সাগরিকার সঙ্গে। কী বলেছেন, তাঁরা নিজেরাই ঠিক জানেন না। একরকম ঘোরের মধ্যেই যে ছিলেন তাঁরা দুজন। পরদিন গ্রামের মানুষ পত্রপত্রিকা কিনে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। পত্রিকার পাতায় মেয়ের বড় বড় ছবি দেখে তাঁরা অবাক। এসব স্বপ্ন, না সত্যি?

লিটন আলী বোঝেন, তাঁর মেয়ে নিজের স্বপ্নকেই সত্যি করেছেন। গ্রামের পাশের বাড়িতে নিজের বোন সম্পর্কের লুনার কথাও বললেন তিনি। সাগরিকার খালা লুনা মানসিক সমর্থন দিয়েছিলেন সাগরিকাকে, ‘লুনা আমাদের পাশের বাড়িতে থাকেন। সাগরিকা ওকে খালা ডাকে। লুনাও সাগরিকাকে খুব ভালোবাসেন। উনি বলেছিলেন, “আপনারা যদি মেয়েকে ফুটবলার হতে না দেন, তাহলে ওকে আমাকে দিয়ে দিন। আমি ওকে ফুটবলার বানাব।”’

সাফ অনূর্ধ্ব–১৯ ফুটবলে মেয়েদের মুখে এমন হাসিই দেখতে চায় বাংলাদেশ। সাগরিকা কি পারবেন শেষ বাঁশি বাজার পর সেই হাসি এনে দিতেপ্রথম আলো

লুনা খালার কথা নেপালের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পরপরই বলেছিলেন সাগরিকা। আনজু বেগম বললেন, ‘লুনা আমাদের গ্রামের শিক্ষিত মেয়ে, ওর মনমানসিকতাই অন্য রকম। সে আমার মেয়েকে খুব আদর করে। সে আমাদের বুঝিয়েছে, মেয়ের ইচ্ছাকে সম্মান দেওয়াটা কত জরুরি।’

লিটন আলী আর আনজু বেগম মেয়েকে ফুটবলার হতে দিয়েছেন। সারা দেশ এখন তাঁর মেয়েকে চেনে। আজ কমলাপুর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে মেয়ের খেলা দেখবেন তাঁরা। জাতীয় সংগীতের সুরে কণ্ঠ মিলিয়ে নামবে তাঁদের কন্যা। সারা দেশ তাঁদের মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবে একটা গোলের জন্য।