ঢাকাশনিবার , ৮ এপ্রিল ২০২৩
  • অন্যান্য

বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে টাকা

অনলাইন ডেস্ক
এপ্রিল ৮, ২০২৩ ৪:০৪ অপরাহ্ণ । ৬৩ জন
ছবি: সংগৃহীত

শিশু জন্মের ছয় সপ্তাহের মধ্যে পাঁচবার টিকা দিতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় প্রত্যেক নবজাতককে কমপক্ষে পাঁচবার টিকাকেন্দ্রে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে টাকা। এনজিওর মাধ্যমে শিশুকে এই টিকা দেওয়ার কারণে সংস্থাগুলো অভিভাবকদের কাছ থেকে ‘সার্ভিস চার্জের’ নামে নিজেদের ইচ্ছামতো টাকা নিচ্ছে। রাজধানীর পূর্ব মেরুল বাড্ডার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের নিমতলী রোডের পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে (পিসিডিও) শিশুর অভিভাবকদের কাছ থেকে বিনামূল্যের টিকার বিপরীতে টাকা নেওয়ার সত্যতা মেলে।

শিশুদের যে টিকাগুলো দিতে হয়, সেগুলো হলো—প্রথমবার বিসিজি, পেন্টা-১, ওপিভি-১, পিসিভি-১ এবং আইপিভি-১, দ্বিতীয়বার পেন্টা-২, ওপিভি-২, পিসিভি-২, তৃতীয়বার পেন্টা-৩, ওপিভি-৩, পিসিভি-৩ এবং আইপিভি-২, চতুর্থবার এমআর প্রথম ডোজ, পঞ্চমবার এমআর দ্বিতীয় ডোজ।

২৯ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে দেড় মাসের ছেলে মুয়াজকে পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছিলেন মাহফুজা। তিনি জানান, প্রথমবার বিসিজি, ওপিভি-১ এবং আইপিভি-১ তিনটি ডোজে তাকে

গুনতে হয়েছে ৫০০ টাকা। পরে বলে দিয়েছে, বাকি দুটি এক সপ্তাহ পর ৫ এপ্রিল নিতে গেলে লাগবে ৪০০ টাকা। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চমবার টিকা দিতে আরও টাকা গুনতে হবে তাকে। প্রথম তিনটি ডোজে ৫০০ টাকা নিলেও কার্ডের ভেতরে বামপাশের কর্নারে অঙ্কে ৩০০ লেখা রয়েছে। বাকি ২০০ টাকার কথা কার্ডে উল্লেখ নেই। ৫ এপ্রিল পেন্টা (ডিপিটি, হেপ-বি, হিব), পিসিভি টিকা দিতে গুনতে হয়েছে ২০০ টাকা। রসিদ চাওয়ায় ৪০০ টাকার কথা বললেও নেয় ২০০ টাকা। আনাড়ি হাতে প্রথমবার নবজাতকের দুই হাতে টিকা দেওয়ায় রক্ত বের হচ্ছিল।

প্রতিবার টিকার জন্য টাকা চাওয়া প্রসঙ্গে মাহফুজা বলেন, টিকাদানকারীকে জিজ্ঞেস করি এটি তো সরকারি টিকা। আপনি টাকা নিলেন, প্রাপ্তির রসিদ দিন। তারা রসিদ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রথমবার তারা রসিদ না দিলেও দ্বিতীয়বার অর্থ প্রাপ্তির রসিদ দিয়েছে।

আরেক অভিভাবক তার নবজাতককে তৃতীয় ডোজ দিতে নিয়ে এসেছিলেন এখানে। প্রথম-দ্বিতীয় ডোজ চট্টগ্রামে দিয়েছেন। অন্যদের সঙ্গে টিকা দেওয়ার দরদাম দেখে তিনি এগিয়ে এসে বলেন, একেক ডোজ টিকা দিতে এত টাকা লাগবে? তাহলে আমার ছেলের কত টাকা লাগবে? টিকাদান কর্মী তানিয়া তাকে বলেন, ২০০ টাকা। কার্ডও করতে হবে। তিনি অবাক হয়ে বলেন, একেক ডোজ ২০০ টাকা! অভিভাবক আগের টিকা প্রদান কার্ডের ফটোকপি তাদের সামনে এগিয়ে দিতেই পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের ম্যানেজার মাসুমা ইসলাম বলেন, এই কার্ডে হবে না। আপনি চট্টগ্রাম থেকে দুইবার দিয়েছেন। এখানে নতুন কার্ড বানাতে হবে।

ওই অভিভাবক অনুনয়-বিনয় করে বলেন, ‘আপা আমি অনেক গরিব মানুষ। ওখানে ৩০ টাকা দিয়ে টিকা দেওয়ালাম। আমার যদি এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থাকত, তাইলে সরকারি টিকা দেওয়াতে আসতাম না।’

নবজাতককে নিয়ে তৃতীয়বার টিকা দিতে আসেন আরেক মা। সচ্ছল পরিবারের হলেও তিনি টিকাদানকারীকে বলেন, অন্য জায়গায় তো অনেক কম টাকা রাখে। আপনারা কম রাখছেন না কেন? এই কথার প্রেক্ষিতে টিকাদানকর্মী তানিয়া সেই অভিভাবককে তিরস্কার করে বলেন, তিনটি খাতা মেইনটেইন করতে হয়। একজনের সুঁই খুলতে হয়। একজনকে ধরতে হয়। এত কিছুর জন্য কি একটি সার্ভিস ফি থাকবে না? প্রতি উত্তরে অভিভাবক বলেন, টিকা তো বিনামূল্যে সরকার থেকে দেওয়ার কথা।

অভিভাবকের কথোপকথনে রাগান্বিত হয়ে পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের ম্যানেজার মাসুমা ইসলাম বলেন, এত কথা বলেবেন না। টিকা দেওয়ার হলে দেন।

২৯ মার্চ নবজাতকদের টিকা কার্ডে টিকা দানকারীর নামের নিচে লেখা রয়েছে তানিয়া। তানিয়া আক্তার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা নবজাতকদের টিকা দেন। গত সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে গেলে দেখা যায় টিকাদানকারী তানিয়া আক্তার চেয়ারে বসে এবং একজন কর্মী বেঞ্চে শুয়ে জি বাংলার সিরিয়াল ‘মিঠাই’ দেখছিলেন। নবজাতককে নার্স না ডাক্তার টিকা দেন এ বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয় তানিয়া আক্তারের কাছে। তিনি এ সম্পর্কে কোনো কথা না বলে উল্টো প্রতিবেদকে জিজ্ঞাসা করেন, তথ্য কী কারণে লাগবে? টিকা দেওয়ার খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ভদ্রমানুষ পুলিশ, এসপি, ডিসি, উকিল আসে। এই প্রতিষ্ঠান সরকারি না, এনজিও। যাদের টাকা নাই, তাদের ফ্রি টিকা দিই।

টিকা বাবদ টাকা নেওয়া প্রসঙ্গে পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের ম্যানেজার মাসুমা ইসলাম  বলেন, দেড় থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের টিকা প্রদানে ৫০ থেকে ১০০ টাকা সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। প্রত্যেক অভিভাবককে টিকাদানের রসিদ দেওয়া হয়। অথচ প্রথম দিনে তিনটি ডোজের জন্য টাকা নিয়েও রসিদ না দেওয়ার ব্যাপারে তিনি অভিভাবককে বলেছিলেন, এটি এনজিও। আপনাদের পরে রসিদ দেব। কিন্তু সেদিনের রসিদ অভিভাবকরা আর পাননি।

ডায়রিয়ার টিকার জন্য টাকা চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি কালবেলাকে বলেন, ডায়রিয়ার টিকা বেসরকারি। কোম্পানির দামে বিদেশের টিকার দাম ৩ হাজার এবং দেশেরটা ১ হাজার ২০০ টাকা পড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এসএম আব্দুল্লাহ আল মুরাদ বলেন, টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের আওতায় এনজিওগুলোকে টিকাদানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তারা নবজাতকদের সরকারি টিকার ডোজগুলো নিয়মিত দিয়ে থাকে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান কালবেলাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কর্মী না থাকায় এনজিওর মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই টিকা এনজিওদের বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। সরকারের লক্ষ্য হলো শিশুদের শতভাগ ভ্যাকসিনের আওতায় আনা। এনজিওরা তেজগাঁও থেকে এই টিকা সংগ্রহ করে নিজ নিজ কেন্দ্রে নিয়ে যায়। যাতায়াতের খরচটা তাদেরই বহন করতে হয়। কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। সেজন্য নামমাত্র চার্জ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যদিও সার্ভিস চার্জ নেওয়ার অনুমতি নেই। সেক্ষেত্রে তারা যদি অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায় করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরও বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি এনজিওকে বাদ দিয়েছি। ফলে সেই এলাকার টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই এলাকার শিশুরা ভ্যাকসিনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।