ঢাকাশনিবার , ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য

প্রতিবন্ধী নারী বিলকিসের জীবন যুদ্ধ

অনলাইন ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৪ ৪:২৭ অপরাহ্ণ । ২৯ জন

জীবনযুদ্ধে এক সাহসী নারী শারীরিক প্রতিবন্ধী বিলকিস। বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়। সংসার পাতলেও সুখের মুখ দেখেননি। দশ বছর আগেই তার সংসার ভেঙেছে। হোঁচট খেয়েও তিনি থেমে থাকেননি। অদম্য সাহস নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা সদরের ধানগড়া বাজারে সেলাই মেশিন নিয়ে কাপড়ের দোকান দিয়েছেন। দোকানের আয় থেকে তার সংসার চলে, ঋণের কিস্তি পরিশোধ হয়। তবে খুব টানাটানি।
রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের করিলাবাড়ি গ্রামের মেয়ে বিলকিস খাতুন (৩৫)। জন্ম থেকেই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী।  কোমর থেকে বাম পা পর্যন্ত অবশ। জন্মের পর থেকেই এই রোগে আক্রান্ত। বাবা সোলায়মান অতিদরিদ্র। মেয়ের চিকিৎসা করাতে পারেননি। এই দরিদ্র পরিবারেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে বিলকিস সবার ছোট। পড়ালেখাও শুরু করেছিলেন গ্রামের স্কুলেই।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে উচ্চবিদ্যালয়ও ভর্তি হয়েছিলেন। শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে হার মানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। উচ্চ বিদ্যালয় বাড়ি থেকে দূরে হওয়ায় হেঁটে যাতায়াত তার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাবার কোনো সামর্থ্য ছিল না যে মেয়েকে বিকল্প ব্যবস্থায় স্কুলে পাঠাবে। সাঙ্গ হয় পড়ালেখা। বিলকিস এক পর্যায়ে  পড়ালেখার  পাঠ চুকিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।  কিন্তু  ঠাঁই হয়নি স্বামীর সংসারেও, মাতৃত্বের স্বাদও পাননি। এক সময় স্বামীর সংসার থেকে ছিটকে পড়েন।

এর মধ্যে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, আশ্রয়স্থল বাবা সোলায়মান মারা যান। বড় ভাই বোনেরা বিয়ের পর তারাও নিজেদের সংসার নিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। স্বামীর সংসার থেকে ছিটকে পড়ে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে কষ্টের সাগরে পড়েন বিলকিস।
কিন্তু থেমে যাননি বিলকিস। প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা পেলে তারাও বদলে দিতে পারেন সমাজ ও পরিবারকে এই সেøাগান তাঁকে সাহস জোগায়। শারীরিকভাবে অসুস্থ বিলকিসের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি ও সামর্থ্য না থাকলেও তিনি থেমে যাননি। জীবন যুদ্ধে বেঁচে থাকার তাগিদে সকল বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন অদম্য সাহস নিয়ে।

কারও দয়ায় বেঁচে থাকা অপমান মনে করে বান্ধবী পাপিয়ার সহযোগিতায় উপজেলা পরিষদের সামনে বিলকিস অ্যান্ড পাপিয়া টেইলার্স অ্যান্ড ফ্যাশন হাউজ নামে একটি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বিআরডিবি থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। ঋণের টাকায় তিনটি সেলাই মেশিন কিছু কাপড় কিনে ব্যবসা চালান। তার হাঁটা চলা সমস্যায় প্রতিদিন বাড়ি থেকে দোকানে যাতায়াত দুরূহ হয়ে পড়ে।

সুস্থ মানুষের মতো হাঁটাচলা করতে না পারায় স্থানীয় এমপি অধ্যাপক ডা. আবদুল আজিজ তাকে একটি অটোরিকশা কিনে দিয়েছেন। সেই রিকশা করে প্রতিবন্ধী বিলকিস তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশোনাসহ সব জায়গায় চলাচল করেন।
বিলকিস বিয়ে করলেও মাতৃত্বের স্বাদ পায়নি। প্রতিটি নারী মা হতে চান, মাতৃত্বের স্বাদ চান। তাই দরিদ্র বড় বোনের ছেলে রাকিবুলকে ঘরে এনে নিজের সন্তানের মতো পড়ালেখা করাচ্ছেন। রাকিবুল তাকে মা সম্বোধন করে ডাকে, এতই বিলকিস খুশি। রাকিবুল রায়গঞ্জের লক্ষ্মীকোলা সরকারি বেগম নুরুন্নাহার তর্কবাগিস কলেজে মানবিক বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সে আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে চায়।
বিলকিস খাতুন বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কোথায়ও কাজের সুযোগ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে দর্জির কাজ বেছে নেই। প্রতিবন্ধী ভাতা ও কাজের আয়ের টাকায় কষ্টে চলে আমার সংসার। উপজেলার সামনে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে এনজিও থেকে লোন নিয়ে সেলাই মেশিন কিনে টেইলার্সের দোকান খুলে বসেছি। ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় দোকানে তেমন কোনো মালামাল তুলতে পারছি না। সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে কেউ আমাকে সহযোগিতা করলে দুই মুঠো ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারতাম।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন জানান, উপজেলায় প্রতিবন্ধীদের কার্ড শতভাগ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বিলকিস খাতুন প্রতিবন্ধী কার্ডের সুবিধা ভোগ করছেন। এ ছাড়াও আমরা তাকে ঋণ দিয়ে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছি।